বুধবার, ১৯-জুন ২০১৯, ০৭:০৯ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • শীর্ষ কাগজে প্রকাশিত ওরিয়নের দুর্নীতির প্রতিবেদন আদালতে সত্য প্রমাণিত হলো 

শীর্ষ কাগজে প্রকাশিত ওরিয়নের দুর্নীতির প্রতিবেদন আদালতে সত্য প্রমাণিত হলো 

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ২৩ মে, ২০১৯ ০৯:৫০ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার নির্মাণে ওরিয়ন গ্রুপের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিল সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ। প্রকাশিত সংবাদ মিথ্যা বলে দাবি করে এর বিরুদ্ধে আদালতে মানহানির মামলা করেছিল ওরিয়ন গ্রুপ। কিন্তু দীর্ঘ সোয়া ৮ বছর মামলা চলার পর অবশেষে সেই মামলায় হেরে গেছে ওরিয়ন গ্রুপ। এতে শীর্ষ কাগজে প্রকাশিত ওরিয়ন গ্রুপের দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. তোফাজ্জল হোসেন উভয়পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে শীর্ষ কাগজ সম্পাদককে বেকসুর খালাস দেন আদালত। 
২০১১ সালের ১২ জানুয়ারি ওরিয়ন গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান বেলহাসা একম অ্যান্ড এসোসিয়েটস এর পক্ষে কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন এই মামলা দায়ের করেছিল। পরে মামলাটির বাদি হন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক তৌহিদুল বাশার। 
ওরিয়ন গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান বেলহাসা একম অ্যান্ড এসোসিয়েটস  গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার নির্মাণের দায়িত্বে ছিলো। মামলাটি দায়ের করা হয় ওই ফ্লাইওভার নির্মাণে দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজের দুটি প্রতিবেদনের কথা এ মামলায় উল্লেখ করা হয়। এর একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিলো শীর্ষ কাগজের ৭ম বর্ষের ২৭ তম সংখ্যায় ২০১০ সালের ৬ ডিসেম্বর। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিলো- “গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার: চোর, টাউট-বাটপারদের খাবার আমরা খাব না”। এর পরের প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিলো শীর্ষ কাগজের ৭ম বর্ষের ২৮ তম সংখ্যায় ২০১০ সালের ১৩ ডিসেম্বর। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিলো, ‘ফ্লাইওভার প্রকল্প: মন্ত্রণালয়ের ফাইল থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র গায়েব’।
“চোর, টাউট-বাটপারদের খাবার আমরা খাব না” এই কথাটি বলেছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্মসচিব আবদুল মালেক। তিনি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ফ্লাইওভার সংক্রান্ত এক বৈঠকে এ কথা বলেন। পরবর্তীতে আবদুল মালেক প্রকাশিত এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেননি। এমনকি আবদুল মালেক বা অন্য যারা ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তাদের কাউকেই বাদি এ মামলায় সাক্ষী হিসেবেও উল্লেখ করেননি। উল্লেখ্য, আবদুল মালেক বর্তমানে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব। 
শীর্ষ কাগজের আরেকটি প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয়ের ফাইল থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র গায়েব হওয়ার যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় কোনো প্রতিবাদ দেয়নি। ‘কাগজপত্র হারানো যায়নি’ এমন কোনো কথাও মন্ত্রণালয় বলেনি। মন্ত্রণালয়ের কাউকে এ মামলায় ওরিয়ন গ্রুপের পক্ষ থেকে সাক্ষীও করা হয়নি। এ মামলায় বাদি ছাড়া আরো যে ৪ জনকে সাক্ষী করা হয় তারা প্রত্যেকেই ওরিয়ন গ্রুপের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। 
প্রসঙ্গত, ২০০৩ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিওওটি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের টেন্ডার আহ্বান করে। টেন্ডার আহ্বানের পর দুবাইভিত্তিক বেলহাসা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কন্ট্রাক্টিং কোম্পানি এলএলসি  ও বাংলাদেশের ওরিয়ন গ্রুপের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। তখন ওই টেন্ডারে জালজালিয়াতির মাধ্যমে  ৩৬৭ কোটি টাকাকে ৬৬৭ কোটি টাকা বানিয়ে কার্যাদেশ দেয়া হয়। কার্যাদেশের এই দুর্নীতি নিয়ে পত্রপত্রিকায় ওই সময় লেখালেখিও হয়। বিএনপি আমলেই বেলহাসা ও ওরিয়ন কার্যাদেশ পেয়ে কাজ শুরু করে। ২০০৬ সালের ৪ জুন নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়। ওই সময় বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে উদ্বোধনী ক্রোড়পত্রে ওরিয়নের মালিক ওবায়দুল করিমের ছবি ও বাণী ছাপা হয়।
কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির কারণে এই কার্যাদেশ বাতিল করে এবং তাদের কাজ বন্ধ করে দেয়। ওই বাতিল কার্যাদেশ নিয়ে মামলা চলছিলো। এরই মধ্যে দুর্নীতিবাজ চক্রের যোগসাজশে তদবির করে নীতিবহির্ভূতভাবে  আবার কার্যাদেশ আদায় করে নেয় ওরিয়ন গ্রুপ। যদিও এ ধরনের ঘটনার নজির অতীতে নেই এবং আদৌ সম্ভবও নয়। অবাক ব্যাপার হলো, পুনরায় কার্যাদেশ নেওয়ার সময় দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বেলহাসাকে  বাদ দিয়ে ভারতীয় কোম্পানিকে নিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করে ওরিয়ন। অথচ, যখন টেন্ডার দাখিল, মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ হয় তখন প্রধান অংশীদার ছিলো বেলহাসা।  বেলহাসার শেয়ার ছিলো ৮৫ শতাংশ। বেলহাসা আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। তাদের যোগ্যতা-অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এই কার্যাদেশটি দেয়া হয়েছিলো। 
শুরুর দিকে যেখানে ৬৬৭ কোটি টাকা নির্মাণ খরচ এই ফ্লাইওভারের জন্য মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল, এত বেশি নির্মাণ ব্যয় ও দুর্নীতির কারণে কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছিল সেখানে পরবর্তীতে এটি দফায় দফায় বেড়ে ২৪০০ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ৪ গুণে দাঁড়ায়। এই টাকা নেয়া হয় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে তাদেরকে শেয়ার দেয়ার কথা বলে। মূলত এই টাকা নিয়ে লুটপাট, ভাগবাটোয়ারা হয়। যে কারণে অস্বাভাবিকভাবে টোলের হারও বৃদ্ধি করা হয়। এ নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে মামলাও হয়। 
এই দুর্নীতি লুটপাটের খবর শীর্ষ কাগজে তুলে ধরার কারণেই ওরিয়ন গ্রুপ ক্ষুব্ধ হয়ে ২০১১ সালে মামলা করে এবং শীর্ষ কাগজের প্রতিবেদনকে সঠিক নয় বলে দাবি করে। কিন্তু আদালতে নিজেদের বক্তব্যের পক্ষে যথাযথ তথ্য প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয় ওরিয়ন গ্রুপ। শীর্ষ কাগজের পক্ষ থেকে ওরিয়নের বিভিন্ন লুটপাটের তথ্য আদালতে দাখিল করা হয়। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৬ মে ২০১৯ প্রকাশিত)