শনিবার, ১৭-নভেম্বর ২০১৮, ১১:০৭ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • বিলুপ্ত পদেও নিয়োগ: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ৬০২ পদে লাগামহীন দুর্নীতি-জালিয়াতি

বিলুপ্ত পদেও নিয়োগ: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ৬০২ পদে লাগামহীন দুর্নীতি-জালিয়াতি

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০৭:১৫ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: তৃতীয় শ্রেণির ৬০২টি পদে কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতিতে রীতিমতো নতুন নজির সৃষ্টি করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এই নিয়োগ পরীক্ষার কার্ড ইস্যু, ভাইভা থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণে পাঠানো, কোটা নিরূপন সবখানেই ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে। এমনকি বিলুপ্ত পদেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে মহাজালিয়াতির মাধ্যমে। শুধু তাই নয় যেসব পদ আদতে ছিলোই না বা অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে সেসব পদও শূন্য দেখিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে ওই পদে লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অবৈধভাবে এসব নিয়োগে ব্যাপক অর্থ লেনদেন করেছে অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। যেমন পোল্ট্রি টেকনিশিয়ান পদে মোট ৬ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অথচ যে ৬ দপ্তরে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তার মধ্যে হাস মুরগি খামার পটুয়াখালী, টাঙ্গাইল, মাদারীপুর ও কুড়িগ্রাম এই ৪ টি দপ্তরের পদই বিলুপ্তকৃত। 
জানা যায়, ৬০২ টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও এর বেশিরভাগ পদই অনেক আগ থেকে মন্ত্রণালয় বিলুপ্ত করেছে। মূলত ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য করতেই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট এই ভুয়া পদগুলোতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসার পর প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী ও সচিব নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত এবং তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন। কিন্তু বর্তমান সচিব মো. রইছ উল আলম মন্ডল পদে বসে তদন্ত কমিটির উপর প্রভাব খাটিয়ে সেই দুর্নীতি ধামাচাপা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এবং তিনি অবৈধভাবে এসব নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করারও ব্যবস্থা করেন। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জানা যায়, ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সীমাহীন দুর্নীতি-জালিয়াতির ঘটনা তুলে ধরে কয়েক দফায় মন্ত্রী-সচিবের কাছে অভিযোগ দেয় বাংলাদেশ পশুসম্পদ ক্যাডার বহির্র্র্ভূত কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। শূন্য পদের তালিকা নিরূপনে অনিয়ম, লিখিত পরীক্ষায় কার্ড ইস্যুতে অনিয়ম, মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণে অনিয়ম,  প্রশিক্ষণে প্রেরণের সময় অনিয়ম,  জেলা কোটাসহ অন্যান্য কোটা নিরূপনে অনিয়মসহ সামগ্রিক দুর্নীতি-জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট এবং বিস্তারিত তথ্য প্রমাণ তুলে ধরে ২০১৭ সালের ৯ অক্টোবর প্রথম দফায় মন্ত্রী বরাবর ওই অভিযোগ দেয়া হয়েছিল। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে মন্ত্রীর নির্দেশে ওই বছরের ১৮ অক্টোবর বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব হাফসা বেগমকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। কিন্তু নিয়োগ কমিটির সভাপতি চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও ফৌজধারী মামলার আসামি ডা.  মো. আইনুল হক ও সদস্য সচিব ডা. মো. আবুল খায়ের তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দফারফা করে তাকে ম্যানেজ করে ফেলেন। এর ফলে ওই তদন্ত আর সামনে আগায়নি। মন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তদন্ত ৫ মাস ধরে ফেলে রাখায় পশুসম্পদ ক্যাডার বহির্র্র্ভূত কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. আফসার আলী তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় ওই কর্মকর্তাকে তদন্ত এগিয়ে নেয়ার অনুরোধও জানান তিনি। কিন্তু ম্যানেজ হওয়া কর্মকর্তা হাফসা বেগম এতে কোনো গুরুত্বই দেননি। ২৫ জানুয়ারি, ২০১৮ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে পদায়ন করা হয় মো. রইছ উল আলম মন্ডলকে। তারই প্রশ্রয়ে উপসচিব হাফসা বেগম তদন্ত কাজ ধামাচাপা দিয়ে রাখেন। কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. আফসার আলী সচিবের সঙ্গেও একাধিকবার সাক্ষাত করে নিয়োগ দুর্নীতি তদন্তের অনুরোধ জানান। কিন্তু সচিব কোন পদক্ষেপ নেননি। অবশেষে সমিতির মহাসচিব আফসার আলী তদন্তে গড়িমসির ব্যাপারে সচিব রইছ উল আলম মন্ডলকে লিখিত চিঠি দেন। গত ৪ এপ্রিল ২০১৮ তিনি এ চিঠি দেন। কিন্তু ওই চিঠি পাওয়ার পর একে সচিব ব্যবহার করেন বড় অংকের অর্থ আয়ের হাতিয়ার হিসেবে। তিনি ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। তবে এটি ছিল লোক দেখানো। লোক দেখানো তদন্তের অংশ হিসেবে দুর্নীতির অভিযোগকারী আফসার আলীকে ১৪ মে বক্তব্য নেয়ার জন্য ডাকা হয়। আফসার আলী যাতে নির্ধারিত দিনে সেখানে যেতে না পারেন সেজন্য এখানেও তদন্ত কর্মকর্তা অনিয়মের আশ্রয় নেন। আফসার আলীকে উপস্থিত হওয়ার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা ১০ মে চিঠি ইস্যু করেছেন এমনটি দেখানো হলেও ওই চিঠি তার ফ্যাক্সে আসে নির্ধারিত দিনের মাত্র একদিন আগে ১৩ মে। তবুও নির্ধারিত দিন আফসার আলী উপস্থিত হয়ে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতির তথ্যপ্রমাণসহ বক্তব্য  তুলে ধরেন।  এসময় প্রমাণস্বরুপ কিছু ডকুমেন্টসও তদন্ত কর্মকর্তাকে দেয়া হয়। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা তারপরেও আফসার আলীকে লিখিত বক্তব্য দিতে বলেন। এর প্রেক্ষিতে ২০ মে আফসার আলী তার লিখিত বক্তব্য তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দেন। একইসঙ্গে কোন কোন দপ্তরে শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে সেই তালিকা সরবরাহেরও অনুরোধ করেন আফসার আলী। কিন্তু আফসার আলীকে ওই তালিকা তো সরবরাহ করা হয়ই-নি। পরবর্তীতে তাকে কিছু জানানোও হয়নি। উপরন্তু তদন্ত শেষ না করেই বা এ বিষয়ে কোনো সমাধান না করেই দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ৪ টি আদেশে সম্প্রতি এ নিয়োগপত্র জারি করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। 
সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্নীতি-জালিয়াতির পাশাপাশি এমনসব পদে ওই নিয়োগগুলো হয়েছে যেসব পদ অনেক আগেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সূত্র জানায়, ৬০২ টি শূন্য পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও মন্ত্রণালয় পদ বিলুপ্ত করার কারণে আসলে এর বেশিরভাগ পদ ছিলই না। অথচ সেইসব বিলুপ্ত পদেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, এর সবই হয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ সচিব রইছ উল আলম মন্ডলের ছত্রছায়ায়। তিনিই তদন্তের নামে দুর্নীতি-জালিয়াতি ধামাচাপা দিয়ে এসব ভুয়া পদে নিয়োগ চূড়ান্ত করেছেন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,  পোল্ট্রি টেকনিশিয়ান পদে  মোট ৬ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যে ৬ দপ্তরে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তার মধ্যে ৪ টি পদ বিলুপ্তকৃত (হাস মুরগি খামার পটুয়াখালী, টাঙ্গাইল, মাদারীপুর ও কুড়িগ্রাম)। কম্পাউন্ডার পদে ২৭ জনকে ২৭ দপ্তরে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে ৯ টি দপ্তরের পদ (বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ, জকিগঞ্জ, দেলদুয়ার, ঈশ^রগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রাজিবপুর, ধোপউড়া, ফুলবাড়ী-কুড়িগ্রাম, পাটগ্রাম,পরশুরাম) আগেই বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে ভিএফএ, এফএ, এআই পদের অধিকাংশ বিলুপ্ত পদ, যেসব পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ভয়াবহ এই নিয়োগ জালিয়াতি তদন্তের জন্য দুদকের প্রতি আহবান জানিয়েছেন বাংলাদেশ পশুসম্পদ অধিদফতরের সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা মনে করেন, তদন্ত কর্মকর্তা সঠিকভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিলে এই দুর্নীতির নিয়োগ চূড়ান্ত হতো না। যে অদৃশ্য হাতের প্রত্যক্ষ ইশারায় এই তদন্ত যথাযথভাবে হয়নি এবং অবৈধ নিয়োগ চূড়ান্তÍ হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা মনে করেন, এ ধরনের জালিয়াতিমূলক নিয়োগ মন্ত্রণালয় ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। এরসঙ্গে জড়িতদের কঠোর বিচার হওয়া উচিৎ।
( সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২২ অক্টোবর ২০১৮ প্রকাশিত)