বুধবার, ১৬-জানুয়ারী ২০১৯, ০৯:০৮ অপরাহ্ন

রাবিশ-খবিশ-খামোশ বনাম সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতা !!

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৯:৩৮ অপরাহ্ন

রাকিব হাসান: ড. কামালের ‘দেখে নেবো, খামোশ’ বলাকে যেমন সাপোর্ট করা যায়না; ঠিক একইসাথে তাঁর মতো একজন খ্যাতিমান আইনজীবী, বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর, দেশের প্রথম আইনমন্ত্রী ও সংবিধান প্রণেতাকেও আপনি মনের মাধুরী মিশিয়ে যা ইচ্ছে তা বলতে পারেন না। এছাড়া তাঁর গাড়িবহরে হামলা এবং তাকে নিয়ে ফেসবুকে যেসব নোংরামী দেখতে পাচ্ছি এটা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের সাংবাদিকদের দুর্ভাগ্য যে, কোনো কোনো রাজনীতিবিদ যখন ‘রাবিশ’, ‘খবিশ’ বা এর চেয়ে জঘন্য শব্দে গালাগাল করেন তখন আমাদের গায়ে লাগে না।তখন কোনো সাংবাদিক নেতাকেও পাশে পাওয়া যায় না, মানববন্ধনের জন্যও কেউ ডাক দেন না। কারণ রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি, চাটুকারিতা ও তৈলমর্দনের এই উন্মত্ত সময়ে ‘রাবিশ’ আর ‘খবিশ’ এর চেয়ে ‘খামোশ’ শব্দটাই আমাদের কাছে মর্যাদাহানিকর এবং আপত্তিকর। কেন? কারণ নানা সমীকরণ আর মেরুকরণে ঘুর্ণায়মান এই দেশের নোংরা রাজনীতির দুষিত জলে সাঁতার কাটতেই আমরা বরং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
কেন তিনি খামোশ বললেন ? তাঁর মতো একজন বিজ্ঞজনের মুখে খামোশ শব্দটি কেন এসেছে? এটা বুঝতে ভিডিও ক্লিপসটার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার দেখলাম। শরুতেই আ.স.ম আব্দুর রব বললেন, ‘খুবই অসুস্থ শরীর নিয়ে ড. কামাল হোসেন শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এসেছেন, আপনারা স্লোগান দেবেন না, ধাক্কাধাক্কি করবেন না’। সেসময় ভিডিওতে ড. কামালকে বেশ বিমর্ষ এবং অসুস্থ দেখাচ্ছিলো।
অসুস্থতা স্বত্বেও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশের চলমান রাজনীতি প্রসঙ্গে দুয়েকটি কথা বলেছেন ড. কামাল। সেসময় তিনি গুছিয়ে কথাও বলতে পারছিলেন না। সম্ভবত সে কারণে ড. কামাল দেড় মিনিটে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। তার বক্তব্য শেষে ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে তিনি স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছিলেন না। অস্থিরতাবোধ করছেন। তখন আ.স.ম রব পূণরায় বক্তব্য শুরু করেন আর তার বক্তব্য চলাকালীন সময়ে ড. কামাল সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে যেতে বলছেন আমি নেমে যাচ্ছি ভাই, আমি আর পারছিনা, অসুস্থ লাগছে। সেই মুহূর্তে কয়েকজন সাংবাদিক জোর করে তার পথরোধ করে প্রশ্ন করতে চাইলেন। তিনি স্পষ্ট বলে দেন এখানে আর কোনো কথা না, বাইরে বলবো।
ঐক্যফ্রন্টে জামায়াত এর উপস্থিতি সম্পর্কে একজন প্রশ্ন করলে তিনি তখন আবারো বলেন, এখানে আর শহীদ স্মৃতিসৌধে কেনো কথা নয়, পরে বলবো। তখন তার সাথে থাকা এক আতœীয়া অনুরোধ জানান, প্লিজ পথ ছেড়ে দাঁড়ান, উনি পড়ে যাবেন। এরপরও তাকে প্রশ্ন করার জন্য থামানো হয়।তখন একজন নারী সাংবাদিক প্রশ্ন করলে (প্রশ্নটি ভিডিওতে বোঝা যাচ্ছে না) তিনি রেগে গিয়ে বলেন, প্রশ্নই উঠে না, বেহুদা কথা বলছো। কত পয়সা পেয়েছো এই প্রশ্ন করতে? কার কাছ থেকে এই পয়সা পেয়েছো? এই জায়গায় দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক প্রশ্ন করো, চিনে রাখবো তোমাকে। পয়সা পেয়ে শহীদ স্মৃতিসৌধকে তোমরা অশ্রদ্ধা করো, আশ্চর্য! শহীদদের কথা চিন্তা করো, হে হে করে হাসছো ? একথা বলার পর যমুনা টিভির আরেকজন সাংবাদিক পাল্টা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন চুপ করো, খামোশ। আবারও ঐ সাংবাদিক প্রশ্ন করলে তিনি এবার বলেন আশ্চর্য ! তোমার নাম কি? কোন পত্রিকায় কাজ করো? ঠিক আছে চিনে রাখলাম।একথার পর তার ভাতিজী তাকে বলেন, আচ্ছা ঠিক আছে চাচা শান্ত হোন, এই বলে হাত ধরে সামনের দিকে নিয়ে যান।
এখন প্রশ্ন- এই ভিডিও ক্লিপসটি কী কেউ পুরোপুরি দেখেছেন? নাকি চিলে কান নিয়েছে বলে এর পেছনে দৌড়াচ্ছেন? পুরো ভিডিও দেখে স্পষ্টতই বোঝা যায় ড. কামাল শারিরীকভাবে প্রচন্ড অসুস্থবোধ করছেন। যিনি মাইক্রোফোন হাতে পেলে আধা ঘন্টার আগে থামেন না সেই তিনি মাত্র দেড়মিনিটে কথা শেষ করলেন। তার অসুস্থতার কারণে স্থান ত্যাগ করে চলে যেতে চাইলেন। বয়সের ভারে ন্যুজ একজন অসুস্থ মানুষ যিনি দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছিলেন না তার গতিরোধ করে তাকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করা কতটুকু ন্যায়সঙ্গত? এটা কী সাংবাদিকতার কোনো ইথিকসের মধ্যে পড়ে? ন্যুনতম মানবিকতাবোধ থাকলে সেসময় কেউ তাকে প্রশ্ন করতেন না, আর তিনিও বিরক্ত হয়ে এরকম অনিয়িন্ত্রিত জবাব দিতেন না।
সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী এবং একজন সাংবাদিক হিসেবে ভালো করেই জানি এবং অন্যদেরও জেনে রাখা দরকার- ‘মানসিক ও শারিরীকভাবে অসুস্থবোধ করছেন এরকম কারো কাছ থেকে জোর করে প্রশ্নের উত্তর আদায় করা যাবে না বা তাকে বাধ্য করা যাবে না। কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা যাবে না, এছাড়া দলীয় লেজুড়বৃত্তির উর্দ্ধে থাকতে হবে, পক্ষপাতমূলক প্রশ্ন করা যাবে না।’ সাংবাদিক হিসেবে কাউকে প্রশ্ন করার আগে এই বিষয়গুলো মগজে গেঁথে রাখা দরকার।
শুক্রবার থেকেই ফেসবুকে দেখছি যারা রাবিশ আর খবিশে চুপ ছিলেন তাদের অনেকে এখন ‘খামোশ’ শব্দে ড. কামালের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করতে আদাজল খেয়ে নেমেছেন। কেউ কেউ তাকে রাজাকার পর্যন্ত বানিয়ে দিচ্ছেন! অনেকে এরকম প্রশ্ন তুলেছেন ৭১ এ ড. কামাল পাকিস্তানে ছিলেন! তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, একাত্তর-এ তিনি শত্রুপক্ষের সাথে হাত মিলাতে যাননি, বরং তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথে পাকিস্তানের কারাগারে বন্ধি ছিলেন।
সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেক কাছ থেকে ড. কামালকে জেনেছি। তাঁর বিনয় এবং ভদ্রতা আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করেছে। ড. কামাল সম্পর্কে কোনো কটুক্তি করার আগে অবশ্যই প্রত্যেকের জেনে নেয়া উচিত কে এই ড. কামাল হোসেন? এদেশে তিনি বানের জলে ভেসে আসেননি। তাঁর ব্যাকগ্রাউন্ড সঠিকভাবে জেনে তারপর কথা বলুন।
যারা প্রশ্নবানে ড. কামালকে জর্জরিত করেছেন তাদের উদ্দেশ্যে আমার প্রশ্ন- দেশের শেয়ারবাজার লুট, ব্যাংক লুট, গুম, এদেশ থেকে ভারতীয়দের নজিরবিহীন অংকের রেমিটেন্স নিয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন প্রকল্পে অস্বাভাবিক খরচ নিয়ে কী সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কোনো প্রশ্ন করতে পেরেছেন ? পারেননি। সেখানে শুধু হাত কচলে তেলের বন্যায় ভাসিয়েছেন, সফরসঙ্গী হয়ে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। শুধু নেহায়েত ভদ্র মানুষ ড. কামালকে পেয়ে বসেছেন।সাংবাদিকতায় পক্ষপাত চলে না। দলীয় লেজুড়বৃত্তি আর চামচামি করার আগে সাংবাদিকতা ছেড়ে দিন। দেশ উপকৃত হবে।
(লেখক: সাংবাদিক)