বুধবার, ২৪-অক্টোবর ২০১৮, ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন

সমকামীতার বৈধতা ও উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপট

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০৮:৪২ অপরাহ্ন

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা: সম্প্রতি ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এক আদেশে সমকামীতাকে বৈধতা দিয়েছে। ভারতীয় দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী অস্বাভাবিক যৌনতা অপরাধ। ১৮৬১ সালের আইন অনুযায়ী, এই অপরাধে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের রায়ের ফলে এই আইন কার্যকারিতা হারিয়েছে।  আবেদনকারীদের পক্ষে বলা হয়েছে, ১৮৬১ সালের ৩৭৭ ধারা সংবিধানের মূল ধারার বিরোধী ও মানবাধিকারের সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন। ২০০৯ সালে দিল্লি হাইকোর্টের এক আদেশে ৩৭৭ ধারা বাতিল করে দেয়। কিন্তু সুপ্রীমকোর্টে তা প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় সমকামীতা এতোদিন অবৈধই ছিল। কিন্তু সুপ্রীমকোর্টের সর্বশেষ আদেশে দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অবৈধ ঘোষণায় সমকামীতা আইনগত বৈধতা পেল। 
মূলত কথিত পশ্চিমা সভ্যতার বিকারগ্রস্থতা থেকেই সমকাম নামক ফেৎনার আবির্ভাব হয়েছে। দ্বৈত যৌন জীবন একটি স্বীকৃত ও স্বাভাবিক মাধ্যম হলেও রুচী বিকৃতির কারণেই যৌনতাকে নানা অপবিশেষণ দেয়া হয়েছে। ১. Gay বা পুরুষ সমকামী, ২. Lesbian বা নারী সমকামী, ৩. Shamale বা হিজড়া, ৪ ইরংবীঁধষ বা দ্বৈত যৌন জীবন। এর মধ্যে চতুর্থ দফা স্বীকৃত ও অতিপ্রাকৃত। অন্যগুলোকে যৌনাচার বলে স্বীকার করার কোন যৌক্তিকতা আছে বলে মনে হয় না। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, যারা নিজেদেরকে সমকামী বলে দাবি করেন তাদের অধিকাংশই তথাকথিত সমকামী নন বরং এদের সিংহভাগই উভকামী। তারা বিয়ে করে সন্তান-সন্ততিও গ্রহণ করেন। কিন্তু বিকৃত মানসিকতাকে চরিতার্থ করতেই নিজেদেরকে সমকামী হিসেবে পরিচয় দেন। যার কোন নায্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে না। 
মূলত সব বিষয়ে যেমন স্বাভাবিক ও স্বীকৃত পন্থা আছে, ঠিক তেমনিভাবে যৌনতাও সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই সংবিধিবদ্ধ। অনেকে সমকামীতাকে মানবাধিকারের সাথে গুলিয়ে ফেললেও তা কোন বিচারেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না। সমকামীতাকে যদি মানবাধিকার বলা হয় তাহলে ড্রাগ নেয়া, আত্মহত্যা ও নিজ শরীরের যেকোন ক্ষতিসাধনকেও বৈধতা দিতে হবে। কারণ, সমকামীতা যেমন অন্যের অধিকার লঙ্ঘন বা ক্ষতি করে না, ঠিক তেমনিভাবে ড্রাগগ্রহণ, আত্মহত্যা বা নিজের শরীরের ক্ষতিসাধনও ব্যক্তিসংশ্লিষ্ট। এতে অন্যের ক্ষতির কোন সম্ভাবনা থাকে না। আত্মহত্যার চেষ্টা সম্পর্কে দন্ডবিধির ৩০৯ ধারায় বলা হয়েছে, Whoever attempts to commit suicide and does any act towards the commission of such offence, shall be punished with simple imprisonment for a term which may extend to one year, or with fine, or with both.
আসলে সমকামীতা কোন কামাচার নয় বরং রুচীবিকৃতির নিকৃষ্টতম পর্যায়। কারণ, এতে অতিপ্রাকৃত নিয়মের লঙ্ঘন করা হয়। মানুষসহ প্রত্যেক জীবের যৌবিক প্রবৃতি নিবৃতির জন্য একটি নিয়মতান্ত্রিক পন্থা রয়েছে। বস্তুত বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শুধু মানুষ নয় সকল জীবই আকর্ষণ অনুভব করে। আর এভাবেই সৃষ্টির ধারাবাহিকতাও রক্ষিত হচ্ছে। মজার বিষয় হলো, মানুষ রুচীবিকৃতির কারণে বিপরীত লিঙ্গের পরিবর্তে সমলিঙ্গে আকর্ষণ অনুভব করলেও কোন ইতরপ্রাণীকে এমনটা কখনো দেখা যায়নি। যদিও সমকামীতার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে কেউ কেউ ইতরপ্রাণী বিশেষের সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণের কল্পকাহিনী প্রচার করে থাকেন। কিন্তু তথ্য-প্রমাণ ও যৌক্তিকতার মানদন্ডে তা গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব হয়নি।
সমকামীতাকে বিশে^র অধিকাংশ দেশেই অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বলা হয়েছে, Unnatural offence-Whoever voluntarily has carnal intercourse against the order of nature with man, woman or animal shall be punished with imprisonment life or with imprisonment of either description for term which may be extend to ten years and shall also be liable to fine.’ অর্থাৎ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোন পুরুষ, নারী বা জন্তুর সাথে প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সহবাস করেন, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা দশ বছর পর্যন্ত কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন এবং তদুপরি অর্থদন্ডেও দন্ডিত হবেন।
এই নিবন্ধকে ধর্মতাত্ত্বিক রূপ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও মানবজীবনে ধর্মের প্রভাব একটুও হ্রাস পায়নি। কেউ কেউ নিজেদেরকে নাস্তিক দাবি করেন, ধর্মের অসারতা নিয়ে অনেক বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক যুক্তিও দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশের জীবনই ধর্মের প্রভাবমুক্ত নয়। বিয়ে করেন ধর্মীয় অনুশাসন মেনে। আবার মৃত্যুর পর শেষ কৃত্যটাও ধর্মীয় বিধানেই। ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মের শেকড়টা আরও অনেক গভীরে। তাই যেকোন বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছার আগে আর্ত-সামাজিক প্রেক্ষাপট, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী, আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক প্রভাব বিবেচনায় আনা জরুরি। মূলত উচ্চ আদালতগুলো শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিনিধিত্ব করে না বরং বৈশি^ক পরিমন্ডলে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাবও রয়েছে। ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের সাম্প্রতিক সমকামীতা বিষয়ক রায়ে এই বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষে ধর্মীয় অনুভুতিকে মোটেই বিবেচনায় আনা হয়নি। খুব সঙ্গত কারণেই সমকাম নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান প্রধান ধর্মের অবস্থান আলোচনা করা দরকার। 
ইসলামে সমকাম বা homosexualityসম্পূর্ণ অবৈধ বা হারাম। ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে হযরত লুত (আ.) এর কওমকে (Sodom  আর Gomorrah নগরী) আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন যেসব কারণে এর মধ্যে সমকামিতা ছিল অন্যতম। আল কুরআনে সমকামীতাকে নিকৃষ্টতম পাপাচার ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। "এবং আমি লূতকে প্রেরণ করেছি। যখন তিনি স্বীয় সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বের কেউ করেনি ? তোমরা তো কামবশতঃ পুরুষদের কাছে গমন কর নারীদেরকে ছেড়ে। বরং তোমরা সীমা অতিক্রম করেছ।" (আরাফ ৭:৮১-৮২) "সারা জাহানের মানুষের মধ্যে তোমরাই কি পুরূষদের সাথে কুকর্ম কর? এবং তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্য সঙ্গিনী হিসেবে যাদের সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে বর্জন কর? বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।" (শুয়ারা ২৬:১৬৫-১৬৬)
হাদিসে রাসুল (সা.) এ সমকাম অপরাধ বিষয়টি খুবই সুষ্পষ্ট। ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স) বলেছেন, অভিশপ্ত সে যে কিনা কোন পশুর সাথে কামাচার করে, আর অভিশপ্ত সে যে কিনা সেটা করে যা লুতের সম্প্রদায় করত।" (আহমাদ:১৮৭৮) উল্লেখ, ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় হযরত লুত (আ.) এর কওমের লোকেরা সমকামী ছিল। আর এজন্যই তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।
হিন্দু ধর্মেও সমকামিতা অপরাধ। মনুস্মৃতি হচ্ছে হিন্দু ধর্মের আইনশাস্ত্র। মনুসংহিতার অষ্টম অধ্যায়ের ৩৬৯ এবং ৩৭০ নম্বর ছত্রে দ’জন নারীর মধ্যে সমকামিতা সংঘটিত হলে কি শাস্তি হবে তার উল্লেখ আছে। যদি দুই কুমারীর মধ্যে সমকামিতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাহলে তাদের শাস্তি ছিলো দুইশত মূদ্রা জরিমানা এবং দশটি বেত্রাঘাত ((Manu Smriti chapter 8, verse 369.)
যদি কোন বয়স্কা নারী অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীর (কুমারীর)সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে বয়স্কা নারীর মস্তক মুন্ডন করে দুটি আঙ্গুল কেটে গাধার পিঠে চড়িয়ে ঘোরানো হবে’ (Manu Smriti chapter 8, verse 370.)|
দু’জন পুরুষ অপ্রকৃতিক কার্যে প্রবৃত্ত হলে তাদেরকে জাতিচ্যুত করা হবে এবং জামা পরে তাকে জলে ডুব দিতে হবে (Manu Smriti Chapter11, Verse 175.)|
বৌদ্ধধর্মেও সমকামীতাকে বৈধতা দেয়া হয়নি। ত্রিপিটকের ভাষ্যমতে, অতীত কর্মের কারণেই জন্মগতভাবে তাদের সমকামীতার মানসিকতা সৃষ্টি হয় (মহাবর্গ অ.১০৫)। এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী হচ্ছে, হরমোন ও জিনগত কারণেই জন্মগতভাবে এরকম মানসিকতা তৈরি হয়। যদিও কেন হরমোন ও জিনগুলো সেরকম অস্বাভাবিক আচরণ করে, বিজ্ঞান তার কোনো উত্তর দিতে পারে না। অথচ বৌদ্ধধর্ম সেটার কারণও নির্দেশ করে দিয়েছে এই বলে, সেটা হচ্ছে তাদের পূর্বকৃত কর্মের ফল।
খ্রীষ্টধর্মেও বলা হয়েছে, সমকামীরতা এক ধরনের পাপ (আদিপুস্তক-১৯:১-১৩; লেবীয়-১৮:২২; রোমীয়-১;২৬-২৭; ১ করিন্থীয়-৬:৯) রোমীয় ১:২৬-২৭ পদ সুনিদিষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, ঈশ^রের অবাধ্য হওয়া এবং তাকে অস্বীকার করার ফল স্বরূপ সমকামীদের শাস্তি দেয়া হয়েছে। লোকেরা যখন অবিশ্বা কারণে পাপ করতেই থাকে, তখন ঈশ্বর ‘লজ্জাপূর্ণ কামনার হাতে’ তাদের ছেড়ে দেন যেন তারা আরও জঘন্য পাপে ডুবে যায় এবং ঈশ^রের কাছ থেকে দূরে থাকার ফলে নিষ্ফল ও নৈরাশ্যের জীবন অনুভব করতে পারে। ১ করিন্থীয় ৬:৯ পদে বলা হয়েছে, যারা সমকামীতায় দোষী তারা ঈশ^রের রাজ্যের অধিকার পাবে না। বাইবেলে বলা হয়েছে, লোকেরা পাপের কারণে সমকামী হয়  (রোমীয়-১:২৪-২৭)
সমকামীতার সাথে জীববিজ্ঞান কী তা নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে। এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস সমলিঙ্গের প্রতি যৌনাকর্ষণের পেছনে সামাজিক নির্ণায়ক (social factor)  ও জীববৈজ্ঞানিক উভয়বিধ কারণ যুগপৎভাবে সক্রিয়। মানুষের স্বভাব গঠনে ক্রিয়াশীল জিন ও হরমোন এবং সামাজিক নির্ণায়কসমূহ (social factor) মিশ্রিতভাবে এই যৌন অভিমুখিতা নির্ধারণ করে থাকে বলে বিজ্ঞানীগণ মত দিয়েছেন। 
যৌন অভিমুখিতা ব্যাখার ক্ষেত্রে  জীববিজ্ঞানের তত্ত্বসমূহ বেশ জনপ্রিয়। এতে বংশানুক্রমিক বিষয়ের (genetic factor)  জটিল অন্তক্রিয়া সহ মস্তিষ্ক এবং মাতৃগর্ভকালীন প্রাথমিক জীবনের পরিবেশ (early uterine environment)  নিয়েও আলোচনা করা হয়। এই বিষয়গুলো জিন, জন্মপূর্বে মার্তৃগর্ভে হরমোন এবং মস্তিষ্কের গঠনের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং ব্যক্তির বিষমকামী, সমকামী, উভকামী ও নিষ্কামী যৌন-অভিমুখিতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
বিংশ শতাব্দী জুড়ে, মনোবিজ্ঞানের সাধারণ মানদন্ড অনুযায়ী রোগনির্ণয়ক আদর্শসমূহের পরিভাষায় সমকামিতাকে মানসিক অসুস্থতা হিসেবে দেখা হত। পরবর্তীতে গবেষণাগুলো যখন এই সিদ্ধান্ত সঠিক কিনা; তা পরীক্ষা করা শুরু করে; তারা এর সপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণাদি হাজির করতে ব্যর্থ হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আচরণিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের বহু অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ একে মানসিক অসুস্থতা হিসেবে গ্রহণ করার মাঝে আবদ্ধ থাকেন। পরবর্তীতে, অনেকেই এই সিদ্ধান্তকেই সঠিক বলে দাবি করতেন, এবং মানসিক অসুস্থতার ডিএসএম নির্দেশিকার সংজ্ঞায়নেও প্রচলিত প্রভাবশালী সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা-ভিত্তিক বিশ্বাস, পুনর্বাসন সংস্থা ও অপরাধমূলক আইনি বিচার-সংস্থাগুলোর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
১৯৭০-র পর থেকে বিশ্বজুড়ে বহু স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং আচরণগত-সমাজবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ সমকামীতাকে মানব যৌন অভিমুখীতার একটি স্বাস্থ্যকর প্রকরণ হিসেবে দেখেন, যদিও কিছু বিশেষজ্ঞ একে অসুস্থতা হিসেবে বহাল রাখেন। তবে ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে অস্ট্রেলীয়া ও নিউজিল্যান্ডের মনোরোগ সংস্থা সমকামীতাকে অসুস্থতার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়। অবশ্য, মার্কিন মনোচিকিৎসক সমিতির প্রতিনিধি কাউন্সিল ১৯৭৫ সালে এবং এরপর অন্যান্য স্বাস্থ্য ও মনস্তত্ব বিষয়ক বৃহত্তর সংস্থাগুলো উক্ত নতুন সংজ্ঞা অনুসরণ শুরু করে, যার মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ১৯৯০ সালে মানসিক বিকৃতির তালিকা থেকে সমকামিতাকে বাতিল করে দেয়। 
মূলত সমকামীতাকে বৈধতা দেয়ার পূর্বসিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী এসব গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। কোন কোন গবেষক সমকামীতাকে স্বাভাবিক যৌনাচার ও স্বাস্থ্যসম্মত বলে এই নষ্টামীর পালে হাওয়া দিচ্ছেন। অথচ মানব দেহের গঠনতত্ত্ব অনুযায়ী সমকামীতা একেবারেই অস্বাভাবিক। মানুষের শরীরের গঠনটাও এমন যে, একজন পুুরুষ ও একজন নারীই কেবল সুষ্ঠু ও সাবলীল যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। জীববিজ্ঞানও নারী-পুরুষের মধ্যে যৌন সম্পর্ককে স্বাভাবিক সম্পর্ক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নারী ও পুরুষের মিলনের মাধ্যমেই কেবল সন্তান জন্ম নেয়।
সমকাম যে স্বাস্থ্যসম্মত নয় তাও বিভিন্ন গবেষণায় ওঠে এসেছে। সাম্প্রতি এক গবেষণার ফলাফলে জানা গেছে,‘...সমকামীদের প্রায় ৯০% সম্পর্ক অ্যানাল সেক্সের সাথে সম্পর্কিত। অস্বাভাবিক বা বিকল্প পন্থায় যৌনাচার করা হলে তা ভাইরাস সৃষ্টিতে সহায়ক হয়।.....শারিরীক ক্ষতিসাধনে সমকামী পুরুষদের যৌনাচারের প্রকৃতি উল্লেখযোগ্য। যা পেনাইল-অ্যানাল, মাউথ-প্যানাইল, হ্যান্ড অ্যানাল এমনকি মাউথ অ্যানাল সম্পর্ক আন্ত্রিক জীবাণুর মাধ্যমে রোগ সৃষ্টি করতে খুবই সহায়ক হয়। ....ক্ষত থেকে শরীরের ভেতরে জীবানু প্রবেশ করে এবং অ্যানো-জেনিটাল সিফিলিসটিক আলসারের সৃষ্টি হয়। ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়। মূত্র- R R Wilcox,` Sexual Behavior and Sexually Transmitted Disease Patterns in Male Homosexuals, British Journal of Venereal Diseases, 57(3): 167-169,167 (1981)
মূলত ভারতীয় সুপ্রীমকোর্টের সম্মানিত বিচারকগণ অনেকটা আবগতাড়িত হয়ে সমকামকে বৈধতা দিয়ে রায় প্রদান করেছেন। এখানে আর্ত-সামাজিক, আন্তঃরাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় ও জনমতের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আনা হয়নি। বিবেচনায় আনা হয়নি উপমহাদেশে এর নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি। আমরা লক্ষ্য করেছি, যেসব মামলার বিষয়বস্তু ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সম্পৃক্ত সেসব বিষয়ে ধর্মীয় স্কলারদের মতামত গ্রহণ করার রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু ভারতের সমকাম বিষয়ক সুপ্রীম কোর্টের এই রায়ে কোন ধর্মের এক্সপার্টদের মতামত গ্রহণ করা হয়নি।
সমকাম বৈধতা বিষয়ক ভারতীয় সুপ্রীমকোর্টের রায়ে পুরো উপমহাদেশেই এর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, কোন দেশের উচ্চ আদালতের রায় একই বিষয়ে ভিন্নদেশে নজীর হিসেবে গ্রহণের রেওয়াজ রয়েছে। যদিও তা বাধ্যতামূলক বা Mandatory নয়। তবু প্রতিবেশী দেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমকামীতার অধিকার চেয়ে মামলা করা হয় তাহলে ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের রায় সে মামলায় নজির হিসেবে গ্রহণ করা হতে পারে। এর আগে ভারতীয় সুপ্রীম কোর্ট বিবাহ বহির্ভূত বসবাসকেও বৈধতা দিয়েছিলো। সর্বশেষ, পরকীয়াকেও সেদেশের সুপ্রীমকোর্ট বৈধ বলে রায় দিয়েছে। আশংকার বিষয় হচ্ছে, ভারতীয় সুপ্রীমকোর্টের ধারাবাহিক এমন অদ্ভুত রায় উপমহাদেশের জনজীবনে একটা ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তা মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। তাই মামলাগুলোর রায় আবারও রিভিউ হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মানুষ। (smmjoy@gmail.com)
শীর্ষ নিউজ/ওআর