শুক্রবার, ১৭-আগস্ট ২০১৮, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন

পলাশী ট্রাজেডি : প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে অস্তমিত স্বাধীনতার সূর্য 

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০২ জুলাই, ২০১৮ ০৮:৫৫ অপরাহ্ন

হাসান আল বান্না: ২৩ জুন। ঐতিহাসিক পলাশী ট্রাজেডি দিবস। এটি বাঙালির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। দুইশ ছাপ্পান্ন বছর আগে ১৭৫৭ সালের এই দিনে এক সফল প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে যুদ্ধের প্রহসন হয়েছিল ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে। সেদিন তরুণ নবাব সিাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়।
ষোল শতকের শেষের দিকে ওলন্দাজ, পর্তুগীজ ও ইংরেজদের প্রাচ্যে ব্যাপক বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। এক পর্যায়ে ইংরেজরা হয়ে যায় অগ্রগামী। এদিকে বাংলার সুবাদার-দিওয়ানারাও ইংরেজদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৭১৯ সালে মুর্শিদকুলী খাঁ বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন। তার মৃত্যুর পর ওই বছরই সুজাউদ্দিন খাঁ বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসন লাভ করেন। এই ধারাবাহিকতায় আলীবর্দী খাঁর পর ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিরাজউদ্দৌলা বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসনে আসীন হন। তখন তার বয়স মাত্র ২২ বছর। তরুণ নবাবের সাথে ইংরেজদের বিভিন্ন কারণে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া রাজ সিংহাসনের জন্য লালায়িত ছিলেন সিরাজের পিতামহ আলীবর্দী খাঁর বিশ্বস্ত অনুচর মীরজাফর ও খালা ঘষেটি বেগম। ইংরেজদের সাথে তারা যোগাযোগ স্থাপন করেন। ফলে নবাবের বিরুদ্ধে নীল-নকশা পাকাপোক্ত হয়।
দিন যতই গড়াচ্ছিল এ ভূখণ্ডের আকাশে ততই কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিল। ১৭৫৭ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতা পরিষদ নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার পক্ষে প্রস্তাব পাস করে। এই প্রস্তাব কার্যকর করতে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ রাজদরবারের অভিজাত সদস্য উমিচাঁদকে ‘এজেন্ট’ নিযুক্ত করেন। এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়ক মীরজাফর তা আঁচ করতে পেরে নবাব তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করে আব্দুল হাদীকে অভিষিক্ত করেন। কূটচালে পারদর্শী মীরজাফর পবিত্র কুরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ করায় নবাবের মন গলে যায় এবং মীরজাফরকে প্রধান সেনাপতি পদে পুনর্বহাল করেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিকরা বলেন, এই ভুল সিদ্ধান্তই নবাব সিরাজের জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ায়।
ইংরেজ কর্তৃক পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গকে সাহায্য করা, মীরজাফরের সিংহাসন লাভের বাসনা ও ইংরেজদের পুতুল নবাব বানানোর পরিকল্পনা, ঘষেটি বেগমের সাথে ইংরেজদের যোগাযোগ, নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার, কৃষ্ণ বল্লভকে ফোর্ট উইলিয়ামের আশ্রয় দান প্রভৃতি কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সকাল সাড়ে ১০টায় ইংরেজ ও নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মীর মদন ও মোহন লালের বীরত্ব সত্ত্বেও জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ কূচক্রী প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের পরাজয় ঘটে। সেই সাথে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য পৌন দু’শ বছরের জন্য অস্তমিত হয়।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বৃহস্পতিবার দুই পক্ষ পলাশীর প্রান্তরে মুখোমুখি হয়। নবাবের বাহিনী নিয়ে কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভ, মীরজাফর ও মীর মদন। মোহলাল সহ দেশপ্রেমিক সৈন্যরা নবাবের পক্ষে যুদ্ধ শুরু করলেন। তাদের হামলায় ইংরেজ বাহিনীর অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে। কিন্তু মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় সে দিন একতরফাভাবে পলাশীতে জয়ী হয়ে ক্লাইভ বিজয়ীর বেশে মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করেন। সে দিন প্রত্যেকে যদি একটি করেও ঢিল ক্লাইভের দিকে নিক্ষেপ করত তবে সেখানেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা দখলের স্বপ্নসাধ ধুলোয় মিশে যেত। ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে তথাকথিত যুদ্ধের পর সিরাজ-উদ্-দৌলা শিশুকন্যা জোহরাকে নিয়ে গোপনে নৌকাযোগে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। পথিমধ্যে রাত যাপনের জন্য রাজমহলের এক মসজিদে আশ্রয় নিলে এর মোতওয়াল্লি দানেশ ফকির বিশ্বাসঘাতকতা করে নবাবকে শত্রুপক্ষের হাতে তুলে দেন। মালদহের ফৌজদার এবং মীরজাফরের ভাই দাউদ খান নবাবকে সপরিবারে বন্দী করে মীরজাফরের জামাতা মীর কাসেমের হেফাজতে মুর্শিদাবাদ পাঠিয়ে দেন। 
কুখ্যাত মিরনের আদেশে আলীবর্দী খাঁর পালিত নিমকহারাম মোহাম্মদী বেগ জাফরগঞ্জ প্রসাদে নির্জন কক্ষে ২ জুলাই গভীর রাতে নৃশংসভাবে সিরাজকে হত্যা করে। ষড়যন্ত্রকারীরা বিজয় মিছিল শেষে লাশ বাজারের এক ময়লার স্তূপের নিক্ষেপ করে। এ অবস্থায় মাত্র একজন মানুষ সন্ধ্যার পর গিয়ে হাজির হলেন মীরজাফরের দরবারে, তার নাম মীর্জা জয়নুল আবেদীন তিনি মীরজাফরের কাছে সিরাজের লাশ দাফনের অনুমতি চাইলেন। মীরজাফর, ক্লাইভ, জগৎশেঠ, ইয়ার লতিফ ও রাজবল্লভের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন, জয়নুল আবেদীনকে সিরাজের লাশ দাফনের জন্য দেওয়া যাবে, তবে তাকে মুর্শিদাবাদ শহরের বাইরে নিয়ে দাফন করতে হবে। মীর্জা জয়নুল সিরাজের খণ্ড-বিখণ্ড লাশ ভাগীরথী নদীর ওপারে নিয়ে যান। ভাগীরথী নদীর পানি দিয়ে সিরাজকে গোসল করান। তারপর খোশবাগে নবাব আলীবর্দী খাঁর সমাধিসৌধের বারান্দায় তাকে দাফন করেন।
পলাশীর এই ঘটনা যুদ্ধ না-বলে এক ট্রাজেডি বা বিপর্যয় বলাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। কেননা যুদ্ধ করে জয় পরাজয় এক কথা। কিন্তু যুদ্ধ না-করে যে পরাজয় বরণ করতে হয় তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেকে এ ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ইতিহাসের নিন্দনীয় প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে যুদ্ধের প্রহসন হয়েছিলো পলাশীর আম্রকাননে। সেদিন দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা পরাজিত হন এবং বাংলার শেষ স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়। একদল লোভী, ষড়যন্ত্রকারী, স্বার্থান্বেষী, দেশদ্রোহী হিন্দু-মুসলিম মিলিত মানুষরা দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার মত লোককে পরাজিত ও হত্যা করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছিল। পলাশীর ঘটনা একটি সাধারণ ঘটনাই নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাসহ এ অঞ্চলের মানুষের ২০০ বছরের পরাধীনতার শিকল। 
নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা সততা, দক্ষতা আর দেশাত্মবোধ নিয়ে ১৪ মাস ১৪ দিন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা শাসন করেন। মাতামহ আলীবর্দী খাঁ শত্রুদের দমন এবং প্রজাদের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং সব অন্যায়-অবিচার দূর করার উপদেশ দেন। মাতামহের মৃত্যুশয্যায় সিরাজ পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে শপথ করেন দেশ, মাটি ও মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবেন। সিরাজকে পরিবারের ভেতরে-বাইরের শত্রুদের ব্যাপক মোকাবেলা করতে হয়। নবাব পদে সিরাজের মনোনয়নে ঘসেটি বেগম, রাজবল্লভ, মীরজাফর ও শওকত জং তার প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। মুর্শিদাবাদের শাসক শ্রেণী ও প্রভাবশালী মহল প্রথম দিকের নবাবদের সময় ধনসম্পদ কুক্ষিগত করার কাজে নিয়োজিত ছিল, সিরাজ শাসন ক্ষমতায় আরোহণের সাথে সাথে এ গোষ্ঠী আশঙ্কা করে যে, তরুণ নবাব বিপজ্জনক হতে পারে। সিরাজের সিংহাসন লাভ ইংরেজদের জন্য ছিল হুমকিস্বরূপ। কেননা পূর্ববর্তী নবাবদের মতো সিরাজ তাদের অধিকারের অপব্যবহার মেনে নিতে অস্বীকার করেন। 
চক্রান্তকারীরা ইংরেজদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে মুসলিম জাতিসত্ত্বার কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের পরিবর্তে সাময়িক কায়েমি ও স্বার্থান্বেষী মহলের ক্ষমতা লাভের চেষ্টা কিভাবে কোটি কোটি মানুষের গলায় গোলামীর জিঞ্জির পরিয়ে দিয়েছে পলাশীর ঘটনাবলী আমাদের তাই স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু ইতিহাসের চরম ট্রাজেডি হচ্ছে কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। সচেতন দেশপ্রেমিকদেরকে তাই পলাশীর পরিণতিকে সামনে রেখে দেশবাসীকে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হবে এবং আরেকটি পলাশীর চক্রান্ত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। উচ্চাভিলাষী মীর জাফর ও বর্ণ হিন্দুদের ষড়যন্ত্রের পলাশী প্রান্তে বাংলার স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়। তাই ঘষেটি বেগম, মীরজাফর ও জগৎশেঠদের দোসরদের কোনভাবে বিশ্বাস করার প্রয়োজন নাই। এটাই পলাশীর শিক্ষা।
মুসলিম শাসকরা যতদিন সংস্কৃতির ব্যাপারে সচেতন ছিলেন ততদিন চারদিক থেকে সমৃদ্ধি এসেছে। কিন্তু যখন তারা শুধু সামরিক ও রাজনৈতিক যোগ্যতার ওপর বেশি নির্ভর করেছেন, তখন তাদের ভৌগোলিক স্বাধীনতাও বিপন্ন হয়েছে। সম্রাট আকবর ‘দীন-ই-ইলাহি’ নামে এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি ধর্ম প্রচার করেন। ফলে উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের পতনের সূচনা হয়। ১৭০৭ সাল থেকেই ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন দুর্বল হতে থাকে। জনকল্যাণের পরিবর্তে আরাম-আয়েশে আগ্রহী হয়ে ওঠার ফলে জনগণের সাথে শাসকদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শত্রুর ব্যাপারে শাসকরা সচেতন ছিলেন না। এ কারণে পলাশীর ঘটনার আগে রাষ্ট্রের শক্তি ও সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ বণিকরা ছিল মুসলিমবিদ্বেষী। আর ব্যবসায়ের আড়ালে এ দেশে তাদের দোসর খুঁজতে থাকে। মুসলমানের দুশমনরাই তাদের নির্ভরযোগ্য বন্ধু হয়ে ওঠে। মুসলিম শাসন ধ্বংস করার জন্য এ দেশের ভেতর একটি শক্তি সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।
পলাশী ট্রাজেডির মীরজাফর-ঘষেটি বেগমের প্রেতাত্মারা এখনো আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র এখনো হচ্ছে। তবে শহীদ নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা প্রতিটি দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য এক অনুকরণীয় প্রেরণা।
উল্লেখ্য যে, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এমন এক ষড়যন্ত্র যার দরুণ একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়। একটি রাষ্ট্র নিঃশেষ হয়। মানুষে মানুষে ভালোবাসা হারিয়ে যায়। পরিবার বিচ্ছেদ হয়। মীর জাফর ও ঘোষেটি বেগমদের প্রেতাত্মারা প্রত্যেক রাষ্ট্রে, প্রত্যেক জনপদে ও অনেক পরিবারে থাকে। এদের চিহ্নিত করতে হয় এবং সময়মত বিষদাঁত ভেঙে দিতে হয়, নতুবা...কোন রাষ্ট্র স্থিতিশীল হবে না। কোন সভ্যতা দীর্ঘস্থায়ী হবেনা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবাব সিরাজ-উদ-দ্দৌলার শাহাদাতকে কবুল করুন এবং মীর জাফর ও ঘোষেটি বেগমদের থেকে আমাদের হিফাজত করুন। আমীন!
(লেখক: কথা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক)
শীর্ষনিউজ/ওআর