বুধবার, ২৪-অক্টোবর ২০১৮, ০২:৪৪ পূর্বাহ্ন

মাহে রমজানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৪ মে, ২০১৮ ০৮:৩৬ অপরাহ্ন

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা: রমজান বা রামাদান শব্দটি আরবী। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এই শব্দটির নির্দেশনামূলক ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। আরবী আভিধানে শব্দটি উত্তাপ, তাপের উচ্চমাত্রা, দগ্ধ করা ও তাপদগ্ধ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর রমজানকে এ সব অর্থে এজন্যই ব্যবহার করা হয়েছে যে, রমজানে  সিয়াম ও কিয়াম সাধনা, সিয়াম পালনকারী সবর ও সহিষ্ণুতার অগ্নি দহনে, সংযমের উত্তাপে ষড়রিপুকে দগ্ধ করে কুপ্রবৃত্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন এবং  নিজেকে পরিশোধিত ও পরিশীলিত মানুষরূপে গড়ে তোলার সুযোগ পান। আরবী সাওম শব্দের অর্থ বিরত থাকা। সিয়াম তার বহুবচন। শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার, কামাচার ও পাপাচার বিরত থাকার নাম সাওম।  শুধুমাত্র পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম পালন নয় বরং নিজের নফসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে জাগতিক লোভ লালসা থেকে মুক্ত থেকে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন রমজান ও সিয়ামের প্রকৃত শিক্ষা।
বস্তুত এ মাস একনিষ্ঠভাবে সিয়াম ও কিয়াম পালনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, প্রশিক্ষণ, আত্মগঠন ও তাকওয়া অর্জনের মাস। তাই এই মাস আমাদের মধ্যে যখন হাজির হয় আমাদের সকলেরই উচিত এই মহিমান্বিত মাসের মর্যাদা যথাযথভাবে রক্ষা করা জাগতিক ও পরলৌকিক কল্যাণ লাভ করা। মানুষ যাতে উল্লেখিত গুণাবলী অর্জন করে কল্যাণ লাভ করতে পারে এজন্যই আমাদের ওপর সিয়াম পালনকে অত্যাবশ্যকীয় করে দেয়া হয়েছে। পবিত্র কালামে হাকীমে ঘোষিত হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম পালনকে অত্যাবশ্যকীয় করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর অত্যাবশ্যকীয় ছিল; যেন তোমরা খোদাভীতি তথা তাকওয়া অর্জন করতে পার’ ( সুরা বাকারা, আয়াত-১৮৩)।
সিয়াম পালনের শুধু যে আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে এমন নয় বরং এর জাগতিক ও বৈষয়িক গুরুত্বের বিষয়টিও অস্বীকার করার মত নয়। প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসাবিদ ড. হেলমুট লুটজানার-এর  The secret of successful fasting অর্থাৎ ‘উপবাসের গোপন রহস্য’ বইটিতে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন ও কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করে নিরোগ, দীর্ঘজীবী  ও কর্মক্ষম স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হলে বছরের কতিপয় দিন উপবাসের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ড. লুটজানারের মতে, “খাবারের উপাদান থেকে সারা বছর ধরে মানুষের শরীরে জমে থাকা কতিপয় বিষাক্ত পদার্থ (টক্সিন), চর্বি ও আবর্জনা থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র সহজ ও স্বাভাবিক উপায় হচ্ছে সাওম বা উপবাস। উপবাসের ফলে শরীরের অভ্যন্তরে  দহনের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে শরীরের অভ্যন্তরে জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থসমূহ দগ্ধীভূত হয়ে যায়।”
সিয়াম পালনের ফলে মানুষের শরীরে কোনো ক্ষতি হয় না বরং অনেক কল্যাণ সাধিত হয়, তার বিবরণ কায়রো থেকে প্রকাশিত  Science for Fasting  গ্রন্থে পাওয়া যায়। পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদগণ একবাক্যে স্বীকার করেছেন, The power and  endurance of the body under fasting Conditions are remarkable; After a fast properly taken the body is literally boom afresh.  অর্থাৎ “রোজা রাখা অবস্থায় শরীরের ক্ষমতা ও সহ্যশক্তি উল্লেখযোগ্য; সঠিকভাবে রোজা পালনের পর শরীর প্রকৃতপক্ষে নতুন সজীবতা লাভ করে।”
মূলত পবিত্র মাহে রমজান আত্মশুদ্ধি, আত্মগঠন, প্রশিক্ষণ ও আত্মগঠনের মাস। কারণ, এ মাসেই কঠোর সিয়াম ও কিয়াম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে সম্পর্ক গভীর হয় এবং নফসের দাসত্বের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায়। মানুুষ যাতে মাসব্যাপী কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তাকওয়া ও তাজকিয়া অর্জনের মাধ্যমে আত্মগঠন করতে পারে এই জন্যই আল্লাহ রাব্বুল আমাদের জন্য সিয়াম পালনকে অত্যাবশ্যকীয় করে দিয়েছেন। আর আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন করে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির অন্যতম ও অপরিহার্য মাধ্যমই হচ্ছে সিয়াম সাধনা। মূলত রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির মহান বার্তা নিয়ে প্রতি বছরই আমাদের মাঝে ফিরে আসে পবিত্র মাহে রমজান। যারা সৌভাগ্যবান শুধু তারাই এ মাসের ফায়দা হাসিল করতে সক্ষম হয়। আর ভাগ্যবিড়ম্বিতরা থাকে উদাসীনই।
আল্লাহ নিজের সঙ্গে সিয়ামের সম্পর্ক ঘোষণা করেছেন। হাদিসে কুদসীতে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখিত হয়েছে। এমনিভাবে সব ইবাদত-বন্দেগি থেকে সিয়ামকে আলাদা মর্যাদাও দেয়া হয়েছে। নিন্মোক্ত হাদিসের বর্ণনা থেকে তার প্রমাণ মেলে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, "তিনি রাসূলকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ), আমাকে অতি উত্তম কোনো নেক আমলের নির্দেশ দিন। রাসূল (সা.) বললেন, তুমি রোজা পালন করো। কারণ এর সমমর্যাদার কোনো আমল নেই" (নাসাঈ)। মূলত সাওম ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম স্তম্ভ এবং অতিগুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত।
হাদিস শরীফে এ মাসের প্রথম দশকে রহমত, দ্বিতীয় দশকে মাগফিরাত ও শেষ দশককে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তাই এই মাসকে গোনাহ মাফ ও মুক্তির মাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়।  বিখ্যাত সাহাবী হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সঙ্গে রমজানে সিয়াম পালন করবে তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সঙ্গে  রমজান মাসের রাত্রিতে এবাদত করবে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সঙ্গে কদরের রাত্রি এবাদতে কাটাবে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।  (বুখারী, মুসলিম)।
পবিত্র রমজান ক্ষমা লাভের মাস। এ মাস পাওয়ার পরও যারা নিজেদেরকে পুত-পবিত্র, অন্যায়-অনাচার, পাপ-পঙ্কিলতা মুক্ত করতে পারলো না রাসূল (সা.) তাদেরকে ধিক্কার দিয়ে বলেছেন, ‘‘ঐ ব্যক্তি ধ্বংস হোক যার কাছে রমযান মাস আসলো অথচ তার গোনাহগুলো ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না।’’ (তিরমিযী)  এই মহিমান্বিত ও মোবারক মাসেই বিশ^ মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল করা হয়। এ মাসে কুরআন নাযিল হয়েছিল বলেই কুরআনের বিশেষ মর্যাদা। মূলত কুরআনের বিশেষ মর্যাদার কারণেই এই মাস মহিমান্বিত ও বরকতময়। সুরা বাকারার ১৮৫ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘রমযান মাস, যে মাসে  কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে’। এই মাসেই ‘লাইলাতুল ক্বদর’ নাম এক মহিমান্বিত রজনী রয়েছে। কালামে পাকে সে রাতকে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলে ঘোষণা করা হয়েছে। সুরা আল ক্বদরের আয়াত ৩ এ বলা হয়েছে, ‘ক্বদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম’। তাই আমাদেরকে একনিষ্ঠভাবে সিয়াম, কিয়াম পালন এবং মাহে রমজানের মর্যাদা রক্ষা করে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন  মুক্তি অর্জন করতে হবে।
রমজান মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনায় অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে।  হাদিসে কুদসীতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, রোজা ছাড়া আদম সন্তানের প্রত্যেকটি কাজই তার নিজের জন্য। তবে রোজা আমার জন্য। আমি নিজেই এর পুরস্কার দেব। রোজা (জাহান্নামের আজাব থেকে বাঁচার জন্য) ঢাল স্বরূপ। তোমাদের কেউ রোজা রেখে অশ্লীল কথাবার্তায় ও ঝগড়া বিবাদে যেন লিপ্ত না হয়। কেউ গালমন্দ বা ঝগড়া বিবাদ করলে শুধু বলবে, আমি রোজাদার। সেই মহান সত্ত্বার কসম যার করতলগত মুহাম্মদের জীবন, আল্লাহর নিকট রোজাদারের মুখের গন্ধ কস্তুরির সুঘ্রান হতেও উওম। রোজাদারের খুশির বিষয় দু’টি। যখন সে ইফতার করে তখন একবার খুশির কারণ হয়। আর একবার যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রোজার বিনিময় লাভ করবে তখন খুশির কারণ হবে। (বুখারী)।
মূলত তাকওয়া, তাজকিয়া ও আত্মগঠনের মাধ্যমে শোষণ, বঞ্চণামুক্ত ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় হচ্ছে সিয়াসের প্রকৃত শিক্ষা। কিন্তু আমরা পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থেকে কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদাতর মধ্যেই সিয়ামকে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। কিন্তু এর প্রকৃত শিক্ষা অনুধাবনের বিষয়ে থাকি রীতিমত উদাসীন। মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষুন্নিবৃত্তিকে উপলব্ধি  করে  করণীয় নির্ধারণে সিয়ামে বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তথা ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় জীবনে  যাতে তাকওয়ার সুষ্পষ্ট প্রভাব সৃষ্টি হয় সে জন্য আমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই বরকতময় বিধানকে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব সংকীর্ণ বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। তাই আমরা পুরো মাস পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থেকে ইবাদাতবন্দেগীতে কাটালেও আমরা সিয়ামের স্বাদ ও প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তাই সিয়াম ও কিয়ামকে অর্থবহ করতে হলে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই সিয়ামের শিক্ষা ও গুরুত্বকে অনুসরণ করতে হবে।
মূলত মহিমান্বিত মাসেই ইসলামের মর্যাদা রক্ষার প্রথম যুদ্ধ ‘বদর যুদ্ধ’ ইসলামের ইতিহাসের বড় বড় ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়েছিল। এ মাসের একটি নফল ইবাদত অন্য মাসের একটি ফরজের  এবং  একটি ফরজ ইবাদত অন্য মাসের ৭০ টি ফরজের সমতুল্য। তাই এই  মাসের গুরুত্ব কাজে লাগিয়ে আমাদেরকে তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনে আত্মনিয়োগ করতে হবে। এ মাসের সিয়াম পালন জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনলো, সালাত কায়েম করলো, যাকাত আদায় করলো, রমযান মাসে সিয়াম পালন করলো তার জন্য আল্লাহর ওপর সে বান্দার অধিকার হলো তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া। (বুখারী) এ পুরো মাস জুড়ে দোয়া কবুল হয়। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘‘এ রমযান মাসে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহ সমীপে যে দোয়াই করে থাকে-তা মঞ্জুর হয়ে যায়।’’
রমযান মাসে সৎ কর্মের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। একটি হাদিসে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেন, রোজা ও কুরআন (কেয়ামতের দিন) আল্লাহর কাছে বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমি তাকে (রমজানের) দিনে পানাহার ও প্রবৃত্তি থেকে বাধা দিয়েছি। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতের বেলায় নিদ্রা হতে বাধা দিয়েছি। সুতরাং আমার সুপারিশ তার ব্যাপারে কবুল করুন। অতএব, উভয়ের সুপারিশই কবুল করা হবে (এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে)। বায়হাকী।
হাদিস শরীফে আরো এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন রমজানের প্রথম রাত্রি আসে শয়তান ও অবাধ্য জিনদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অতপর এর কোনো দরজাই খোলা হয় না। বেহেশতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। অতপর এর কোনো দরজাই বন্ধ করা হয় না। এ মাসে এক আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকে, হে ভালোর অন্বেষণকারী! অগ্রসর হও। হে মন্দের অন্বেষণকারী! থামো। আল্লাহ তায়ালা এ মাসে বহু ব্যক্তিকে দোজখ থেকে মুক্তি দেন। আর এটা প্রতি রাতেই হয়ে থাকে। তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ।
বস্তুত ইসলাম জীবন ঘনিষ্ঠ ও পরিপূর্ণ জীবন বিধান। ইসলাম মানুষকে তার শুধুমাত্র পরকালীন পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে আনুগত্য আদায় করে নিতে চায়না বরং এর মধ্যে জাগতিক কল্যাণও নিহিত রয়েছে। ইসলাম মুসলমানদের উপর এমন কোন অনুশাসন চাপিয়ে দেয়নি যার পিছনে যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক আবশ্যকতার প্রমাণ পাওয়া যায় না। ইসলামের প্রত্যেকটি বিধানের পিছনে উদ্দেশ্য একদিকে জাগতিক কল্যাণ অপর দিকে পারলৌকিক মুক্তির সুস্পষ্ট দিকে নির্দেশনা।  মাহে রমজানের রোজার মধ্যেও রয়েছে সীমাহীন জাগতিক ও বৈষয়িক কল্যাণ। আর সে জন্যেই পৃথিবীর বিদগ্ধ অমুসলিম পন্ডিতগণ রোজার কল্যাণকারিতা সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান মন্তব্য করে গেছেন।
ভারতের স্বাধীনতার জনক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী তথা ‘মহাত্মা গান্ধি’ নিজে রোজা (উপবাস) পালন করতেন এবং অন্যদেরকেও তা পালনে উৎসাহিত করতেন। তিনি তাঁর ভক্তদেরকে বলতেন, যদি তোমরা শরীরকে সতেজ ও সচল রাখতে চাও তাহলে শরীরকে দাও নূন্যতম খাবার আর পূর্ণদিবস রোজা পালন করো। পাকিস্তানের সমকালীন একজন বিজ্ঞ ও প্রসিদ্ধ চিকিৎসাবিদ ডাক্তার মুহাম্মদ তারেক মাহমুদ তার রচিত ‘সুন্নাতে রাসূল ও আধুনিক বিজ্ঞান’ গ্রন্থে রোজা সম্পর্কে পৃথিবীর বেশ কয়েকজন বিখ্যাত মনিষীর মন্তব্য উদ্বৃত করেছেন।
অক্সফোর্ড ইনিভার্সিটির বিশিষ্ট অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী ‘প্রফেসর মুর পাল্ড’ তাঁর আতœজীবনীতে লিখেছেন , আমি ইসলাম সম্পর্কে অনেক বইপত্র অধ্যয়ন করেছি। যখন রোজার অধ্যায়ে পৌঁছলাম তখন আমি বিস্মিত হলাম যে, ইসলাম স্বীয় অনুসারীদেরকে এক মহৎ ফর্মুলা শিক্ষা দিয়েছে। ইসলাম যদি স্বীয় অনুসারীদেরকে অন্য আর কিছুই শিক্ষা না দিয়ে শুধুমাত্র এই রোজার ফর্মুলাই শিক্ষা দিত তাহলেও এর চেয়ে উত্তম আর কোন নেয়ামত তাদের জন্য হত না। আমি চিন্তা করলাম যে, ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখা উচিত। এভাবে আমি মুসলমানদের পদ্ধতিতে রোজা রাখা শুরু করলাম। আমি দীর্ঘদিন ধরে পেট ফোলা (Stomach Inflammation) রোগে ভুগছিলাম। অল্পদিন পরেই অনুভব করলাম যে, রোগ অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। আমি রোজার অনুশীলন অব্যাহত রাখলাম। কিছু দিনের মধ্যে শরীরের আমূল পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করলাম। এভাবে চলতে থাকলে দেখতে পেলাম আমার শরীর স্বাভাবিক হয়ে গেছে এবং দীর্ঘ একমাস পর শরীরে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হল।
হল্যান্ডের একজন নামকরা পাদ্রি ছিলেন ‘পোপ এলফ গাল’ তাঁর দীর্ঘ গবেষণায় রোজার উপকারিতা প্রত্যক্ষ করে তিনি তাঁর অনুসারীদেরকে মাসে তিনটি করে রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন। তিনি হৃদরোগ, ডায়াবেটিক ও পাকস্থলীর রোগে আক্রান্তদের পূর্ণ একমাস রোজা রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ‘সিগমন্ড নারায়াড’ তাঁর গবেষণায় রোজা মনস্তাত্ত্বিক ও মস্তিস্ক রোগের জন্য বিশেষ নিরাময়ী বলে প্রমাণ করেছেন। পৃথিবীর আরো বহু বিদগ্ধ অমুসলিম পন্ডিত রোজার উপকারিতা সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ  মন্তব্য করে গেছেন।
কালামে পাকের ঘোষণা অনুযায়ি সিয়ামকে অত্যাবশ্যকীয় করা হয়েছে আত্মশুদ্ধি, আত্মগঠন ও তাজকিয়া অর্জনের মাধ্যমে ইহলৌকি কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি লাভের জন্য। তাই এই মাসে যথাযথভাবে সিয়াম ও কিয়ামুল লাইলের গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। একই রমজানের শেষ দশকে বিজোর রাতগুলোতে লাইতুল কদর অনুসন্ধান ও ইতিকাফের  মত একনিষ্ঠ ইবাদত করতে পারলেই মাহে রমজান থেকে পুরোপুরি উপকৃত হওয়া সম্ভব। মূলত জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাকওয়া ও আত্মসংযমের ইতিবাচক প্রভাব সিয়াম পালন ও মাহে রমজানের প্রকৃত শিক্ষা। তাই মাহে রমজানের তাৎপর্য ও গুরুত্ব অনুধাবন পূর্বক তা বাস্তব জীবনে প্রতিফলনের ঘটানোর মধ্যেই রয়েছে মানবতার সার্বিক কল্যাণ। (smmjoy@gmail.com)
শীর্ষনিউজ২৪ডটকম/ওআর