স্বজন হননের অন্তরালে
০২:২০ অপরাহ্ন মঙ্গলবার, ২৪-এপ্রিল ২০১৮

স্বজন হননের অন্তরালে

প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০২:৪৪ অপরাহ্ন

ডি. হুসাইন: গণমাধ্যমে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের খুনের খবর থাকে। অনলাইন নিউজ, পত্রিকার পাতা আর স্যাটেলাইট টেলিভিশনের স্ক্রিনজুড়ে খুনের খবর যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা! যা পড়ে পড়ে ও শুনতে শুনতে এখন আমরাও যেন বিষয়টি স্বাভাবিক হিসেবে দেখছি। অভ্যস্ত হয়ে গেছি এর সঙ্গে। তবে এখনো কিছু বিশেষ খুনের খবর আমাদের বিস্ময়াভিভূত  করে। যেমন- রক্তের সম্পর্কীয় আত্মীয়ের হাতে আপনজনকে খুনের মতো খবরগুলো। পুত্রের হাতে পিতার খুন, পিতার হাতে সন্তানের খুন, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন, স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন কিংবা ভাইয়ের হাতে বোনের খুনের মতো খবরগুলো ছিল আমাদের বাঙালি সমাজে প্রায়  অবিশ্বাস্য। কালে ভদ্রে যখন আত্মীয়ের মধ্যকার রক্তারক্তির এমন খবর শুনতাম আমরা, মনে হতো ওই ঘটনা যেন সুদূরবর্তী কোনো পাষাণপুরীর গল্প। অমানবিক, নিষ্ঠুর ঘটনাগুলো বেশ কিছু দিন আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে- আজকাল উপর্যুক্ত খবরগুলো আমাদের কাছে এখন ছিঁচকে চুরি-ছিন্তাইয়ের খবরের মতই মামুলি!  
প্রথমে এক ঐশীর খবর আমরা যতটা চিন্তাগ্রস্ত ও বেদনাগ্রস্ত করেছিলাম সেটা যেন আর নেই।
সম্প্রতি রংপুরে পরকীয়া প্রেমের জেরে স্ত্রীর হাতে স্বামী খুনের খবরটাও কি তবে আমাদের একটুও ভাবিয়ে তুলেনি? বেদনাচ্ছন্ন, ভয়ার্ত, সংকিত করে না?
‘রংপুরের বিশেষ জজ আদালতের পিপি ও রংপুর  আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক   রথীশ চন্দ্র ভৌমিককে স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিক তার কথিত প্রেমিক কামরুলকে নিয়ে স্বামীকে হত্যা করেন।’ ৪ এপ্রিল রংপুর র্যাব-১৩ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন র্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ। নিখোঁজের দুই মাস আগেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২৯ মার্চ রাতে নিজ ঘরেই খুন করা হয় রথীশ চন্দ্রকে। যা দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
কী ভয়াবহ ব্যাপার! পারিবারিক কলহ অবিশ্বাস আর পরকীয়ার মতো অবৈধ দৈহিক সম্পর্কগুলো বিস্তার ঘটতে শুরু করেছে আমাদের সমাজেও। পরিবার প্রথা ভেঙে পড়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেই মূলত এসব ঘটনা ঘটছে বৈকি।
সভ্যতার প্রাচীনতম সংগঠন পরিবার। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, মানব সভ্যতার সূচনালগ্নের সাথে সাথেই পরিবার প্রথার উন্মেষ ঘটে। আমাদের উপমহাদেশীয় সভ্যতা তথা বাঙালি সমাজের একান্নবর্তী পরিবারের অস্তিত্ব ছিল সুসংহত। মানসিক প্রশান্তি, শৃঙ্খলিত যৌন জীবন, পারস্পরিক ভালোবাসা, স্নেহ, মায়া, মমতাবোধ, শ্রদ্ধাবোধ চর্চা একান্নবর্তী পরিবারের ঐতিহ্য। সেই সাথে অর্জিত অর্থ-সম্পদ বা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নিশ্চিত করার ক্ষেত্র পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, ইউরোপ-আমেরিকায় পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বহু আগেই ভেঙে পড়েছে। পরকীয়া, লিভ টুগেদার, অবৈধ সন্তানের জন্ম, সন্তানদের পৈত্রিক পরিচয় নিশ্চিত হতে না পারা কিংবা সন্তানকে অস্বীকার করার মতো বিষয়গুলো বেশ পুরোনো পশ্চিমা সমাজে।
বস্তুবাদী ইউরোপ-আমেরকার অন্ধ অনুকরণের ফলে আমাদের সমাজেও বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ছে অবৈধ দৈহিক সম্পর্ক আর পরিবারবিমুখতার মতো বিষয়গুলো। ফলে স্বামীর হাতে স্ত্রীর, স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন কিংবা বাবার হাতে পুত্রের খুনের মতো ঘটনাগুলো বেড়েই চলছে প্রতিনিয়ত। এর পাশাপাশি ড্রেনে, ডাস্টবিনে, বনে-জঙ্গলে কিংবা রাস্তার পাশে জীবিত-মৃত নবজাতদের পড়ে থাকার খবরও দিনে দিনে বাড়ছে। যা মূলত পাশ্চাত্য অপসংস্কৃতি, সভ্যতার চাকচিক্যময় পোশাকের অন্তঃরালে চরম অসভ্যতার গো-গ্রাস। ফলে আমাদের হাজার বছরের পুরোনো সংস্কৃতি পরিবার ও সামজিক প্রথাগুলো ভেঙে পড়েছে।
এ অবস্থা থেকে মুক্তির পথ হচ্ছে, পরিবার প্রথা মজবুত করা। পরিবারগুলোতে নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসন চর্চা করা। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্নেহ, ভালোবাসার মতো মানবিক দিকগুলোর চর্চা।
আসুন আমরা আমাদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাণবন্ত করে তুলি। কলহমুক্ত সম্প্রীতি ও স্নেহ-ভালোবাসাপূর্ণ পরিবার গড়ে তুলি। যার মাধ্যমে সম্ভব ভারসাম্যপূর্ণ জীবন। যার অনুসরণের মাধ্যমে আমরা আশ্বস্ত হতে পারবো- আপনজনের হাতে স্বজন হত্যার মতো ঘটনা আর ঘটবে না। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হবে। ফিরে আসবে সামাজিক শৃঙ্খলা। সভ্যতার আলোয় দূর হবে অনৈতিক সম্পর্ক ও বস্তুবাদী চিন্তার বিকারগ্রস্ততা।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা কমার্স কলেজ
dalowardcc@gmail.com

শীর্ষনিউজ/এইচএস