সোমবার, ১০-ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:১৬ পূর্বাহ্ন

আনুষ্ঠানিকতা ও নিয়মরক্ষার গণতন্ত্র!

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২২ মার্চ, ২০১৮ ০৭:০৪ অপরাহ্ন

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা: গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার আমাদের সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ হলেও আমাদের দেশের গণতন্ত্র চর্চার পরিসরটা এখনও মসৃণ হয়ে ওঠেনি বরং বারবার কন্টকিত ও কলঙ্কিতই হয়েছে। অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা ও নিয়মরক্ষার গণতন্ত্রই চালু আছে আমাদের দেশে। আর সে ধারা এখনও অব্যাহতই আছে এবং ব্যতিক্রম কিছু না ঘটলে আগামী দিনেও থাকবে বলেই মনে করার যথেষ্ঠ কারণ আছে বৈকি! আমাদের কেতাবে অনেক কিছুই থাকলেও গোয়াল যে প্রায় শূণ্য তা বলতে খুব একটা পান্ডিত্য অর্জনের প্রয়োজন নেই। আসলে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্যই আমরা মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। কিন্তু যে আশায় বুক বেঁধেছিলাম তা অনেকাংশের পূরুণ হয়নি বরং আমাদেরকে বারবার আশাহতই হতে হয়েছে।  
মূলত  স্বাধীনতা প্রত্যেক জাতির জন্যই আরাধ্য ও কাঙ্খিত। কিন্তু আমরা এমনই এক দুর্ভাগা জাতি যে,  অনেক ত্যাগ ও কোরবানীর বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করলেও স্বাধীনতার সুফলগুলো আজও অনেকটা অধরাই রয়ে গেছে। আমাদের কাঙ্খিত গণতন্ত্রও হাতে এসে ধরা দেয়নি। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে আমাদের গণতন্ত্র যেভাবে সমস্যা শঙ্কুল ছিল প্রায় ৫ দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমরা সে সংকীর্ণতার ঘুর্ণাবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছি। তেমন হেরফের হয়েছে বলে মনে হয় না। যা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনকই।   
জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এক দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সে গণতন্ত্রই বারবার সংকটের মুখে পড়েছে। একশ্রেণির রাজনৈতিক মতলববাজ গণতন্ত্র নিয়েই খেলেছেন, এখনও খেলছেন এবং আগামী দিনে যে এর অন্যথা ঘটবে তেমনটা মনে করার মত কোন আভাস আপাত পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা গণতন্ত্রের নামে অনেক লম্বা-চওড়া কথা বললেও নিজেরা এখনও পুরোপুরি গণতন্ত্র মনস্ক হতে পারিনি। এমনকি আমাদের মানসিক দাসত্ব থেকেও বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি।
আর মানসিকভাবে দাসপ্রবণ কোন জাতি কোন জাতিই গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সুফল পেতে পারে না। খুব সঙ্গত কারণেই আমরা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিবর্তে আত্মতন্ত্র চর্চায় অভ্যস্ত হয়েছি। এ মুদ্রাদোষ থেকে আমরা কোন ভাবেই বেরিয়ে আসতে পারছি না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু আমরা জাতীয় স্বার্থভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিবর্তে বিশেষ দল, শ্রেণি ও  গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা ও ক্ষমতাচর্চাকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বানিয়েছে। আর গণতন্ত্রকে বানিয়েছি রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে।  যা আমাদের জাতীয় জীবনের অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে।
আমাদের দেশের প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় চেতনার কথিত মহাজনেরা উপকৃত হচ্ছেন। উপেক্ষিত থাকছেন দেশের সাধারণ মানুষ। এমনকি দালাল-ফড়িয়ারাও কম যাচ্ছে না। কিন্তু আমজনতার ভাগ্যে অশ^ডিম্ব বৈ কিছুই জুটছে না। জনগণের স্বার্থ ও গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে অনেক চটকদার কথা বলা হলেও আমাদের দেশের প্রচলিত গণতন্ত্র একটা সংকীর্ণ গলি পথেই আটকে গেছে। সেখান থেকে অগ্রপশ্চাৎ কোন দিকেই বেরিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে না বরং সময় যত যাচ্ছে ততই সম্ভবনাগুলোরও একের পর এক অপমৃত্যু ঘটছে। আর এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ যে কুসুমাস্তীর্ণ হবে না, বরং কন্টকাকীর্ণ হবে তা অন্তত দিব্যি দিয়েই বলা যেতে পারে।
বর্তমান বিশ^ গণতান্ত্রিক বিশ^। কারণ, মধ্যযুগীয় শাসন ব্যবস্থা বিশে^র প্রায় দেশেই আর নেই। বিশে^র হাতে গোনা কয়েকটি রাষ্ট্র ছাড়া প্রায় সকল দেশেই গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা চালু আছে। আমাদের দেশেও গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা চালু থাকলেও তা নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের অন্ত নেই। কারণ, গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায় তার উপস্থিতিটা খুবই ভঙ্গুর। একথা অনস্বীকার্য যে, গণতান্ত্রিক বিশে^র কোন দেশের গণতন্ত্রই বিতর্ক মুক্ত নয়। কিন্তু তা খুবই সীমিত পরিসরে। তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা থাকলেও তা একেবারে সহনীয় মাত্রায়। তাই প্রত্যেক দেশের নির্বাচন নিয়ে টুকটাক আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য ও বাতিলযোগ্য হয়েছে মর্মে কোন প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু  আমাদের দেশই বোধহয় সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।
কারণ, স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের দেশের নির্বাচন নিয়ে সূক্ষ্ম কাপচুপি, পুকুরচুরি ও সাগর চুরির অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগ বিশে^র অন্যকোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কালেভদ্রেও শোনা যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে এসব অভিযোগ অনেকটা ধাত সওয়া হয়ে গেছে। তাই এসব নিয়ে যাদের ভাবা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার তারা ভাবেন না। আর যারা ভাবেন তাদের হাতে করার মত কিছু থাকে না।  সঙ্গত কারণেই এই বিতর্ক নিরসনে আমরা এখনও কোন গ্রহণযোগ্য ও সমাধানযোগ্য ফর্মূলা বের করতে পারিনি। বিষয়টি নিয়ে মাঠ গরম আর পানি ঘোলা যে হয়নি এমন নয়। কিন্তু অর্জনটা প্রায় অন্তঃসারশূণ্য বলে মনে করার যথেষ্ঠ কারণ আছে।
দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ধারণা থেকেই যে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। বিষয়টি নিয়ে আরও পরিচ্ছন্ন ধারণার সৃষ্টির জন্য আমাদেরকে একটু অতীতের দিকেই তাকাতে হবে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের কোটার ২ টি আসন ছাড়া বাকি সবগুলোতে জয়ী হওয়ার জন্য জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও অর্জন করেছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানের দু’ অংশের মধ্যে মেরুকরণ সৃষ্টি করে। পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো, মুজিবের স্বায়ত্বশাসনের নীতির প্রবল বিরোধিতা করেন। ভুট্টো এ্যাসেম্বলি বয়কট করার হুমকি দিয়ে ঘোষণা দেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মুজিবকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানালে তিনি সে সরকারকে মেনে নেবেন না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিশীলতার মধ্যে ইয়াহিয়া খান সংসদ ডাকতে দেরি করছিলেন। ফলে পূর্ব পাকিস্তানীরা উপলব্ধি করতে পারে যে, আওয়ামী লীগকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও সরকার গঠন করতে দেয়া হবে না। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় শেখ মুজিব জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং মুজিবসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ও জনসাধারণের অসন্তোষ দমনে ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে। পরবর্তীতে স্বাধীনতার ঘোষণা আসে। মূলত আমাদের নায্য অধিকার ও গণতন্ত্রের সংকট থেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় এবং অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলে বিশ^মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের শিশু রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় যে, যে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধিকার অর্জন করেছিলাম তা কিন্তু আজও অধরাই রয়েছে গেছে।
গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যই আমরা মুক্তি সংগ্রামে অবর্তীর্ণ হয়েছিলাম। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাক শাসকচক্র নির্বাচনের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতির কারণেই পাকিস্তানে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে তা সর্বাত্মক স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয়। কিন্তু যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আমরা মুক্তি সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলাম সে গণতন্ত্রকে আজও শৃঙ্খলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। অতীতে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সে তিমিরে রয়ে গেছে। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে তার অবনতিও লক্ষ্য করা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যার বাস্তব প্রমাণও মিলছে।
স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করা  হলেও জনগণ নির্বিঘেœ ভোট দিতে পেরেছিল এবং জনমত যাচাই করা সম্ভব ছিল। এখন সে পথও রূদ্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কাগজে-কলমে গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও দেশের মানুষ আর নির্বিঘেœ ভোট দিতে মোটোই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন না বরং নির্বাচন জনমনে একটা অনাকাঙ্খিত ভীতির সঞ্চার করে। যার প্রমাণ ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন। প্রশ্নবিদ্ধ সে নির্বাচনে শুধুমাত্র ঢাকা সিটির ২৯ টি নির্বাচনী এলাকায় কোন ভোটার ভোট প্রদান করেন নি। এতে প্রমাণিত হয় যে, আমাদের দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর জনগণের  আস্থা এখন প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। কারণ, তারা ধরেই নিয়েছেন যে, আমাদের দেশের সাম্প্রতিক সময়ের নির্বাচনগুলোতে জনমতের প্রতিফলন ঘটে খুবই সামান্য। তাই এই বিষয়ে তাদের আগ্রহটা এখন রীতিমত তলানীতে নেমে এসেছে।
স্বাধীনতা পরবর্তীতে আমাদের দেশে এ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের ১০টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে প্রথম, ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয়, ১৯৮৬ সালে তৃতীয়, ১৯৮৮ সালে চতুর্থ, ১৯৯১ সালে পঞ্চম, ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ, ১৯৯৬ সালে সপ্তম, ২০০১ সালে অষ্টম, ২০০৮ সালে নবম এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১০ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কোন নির্বাচনই বিতর্কমুক্তভাবে অনুষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। শুধুমাত্র ১৯৯১ সালের পঞ্চম ও ২০০১ সালের নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্য নির্বাচনগুলোর চেয়ে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও নির্বাচনে পরাজিত দলগুলো নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে মর্মে অভিযোগ তুলেছিল। তবে তা নির্দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় খুব একটা হালে পানি পায়নি। নবম সংসদের নির্বাচন জরুরি সরকারের অধীনে হলেও এ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের কোন অন্ত ছিল না এবং এখনও নেই।
যাহোক স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ৩টি জাতীয় সংসদের নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় তা অনেকাংশে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। কিন্তু আর অপর নির্বাচনগুলো কোন মহলেরই কাছেই পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য বা বিশ^াসযোগ্য হয়ে ওঠেনি। আমাদের দেশের চরম বাস্তবতায় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। কিন্তু আমাদের ভাগ্যটা মোটেই সুপ্রসন্ন ছিল না। তাই জাতীয় ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতির সুফলও আমরা ধরে রাখতে পারিনি। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। আমাদের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখন মারাত্মক হুমকীর মুখে পড়েছে। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ভিত্তি এখন খুবই ভঙ্গুর। রাজনৈতিক পক্ষগুলো কেউ কারো ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। এতে দেশে এক শ^াসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আর রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই আমরা সেই সংকীর্ণ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না।
আমাদের দেশে যে সুস্থধারার গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চালু নেই তা ক্ষমতার বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও অবস্থান থেকে খুবই পরিস্কার। তারা বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন যে, ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্যই দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধবংস করে দিয়েছে। রাষ্ট্রের সকল অঙ্গকে দলীয়করণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। এমনকি দেশের বিচারবিভাগ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ বিদ্যমান। বিরোধীরা দাবি করেছেন যে, অতীতে যেমন সাজানো ও পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে তা আগামী দিনেও অব্যাহত রাখার জন্যই তাদের কর্মতৎপরতা শুরু করেছে।
মূলত দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করে জনগণের ভোটাধিকার সহ সুশাসন নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও যাতে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সে বিষয়েও কার্যকরি ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকেই। আধুনিক রাষ্ট্রের কোন সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা নির্ভর করে দেশের গণতন্ত্রের বিকাশ ও সুশাসনের ওপর। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সরকার যে পৌণপৌণিক ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে তার প্রমাণ মেলে দেশের রাজনৈতিক সংকটের দিকে লক্ষ্য করলে। কারণ, আগামী দিনের নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এখনও কোন ঐক্যমতে পৌঁছতে পারেনি। ফলে দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট ক্রমেই অবনতির দিকেই যাচ্ছে। এর মধ্যেই জ¦ালানো আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন সরকারি দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী মি. ওবায়দুল কাদের। আগামী একাদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের আনুষ্ঠানিকতা বাকী আছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। যা দেশের আত্মসচেতন ও বিবেকবান মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে।
তিনি কোন রাখঢাক না করেই বলেছেন, ‘নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের মাঝে কোনো ভয় নেই। আমরা আরও আগেই ভয়কে জয় করেছি। আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিজয় হবে। আগামী নির্বাচন আওয়ামী লীগের বিজয়ের আনুষ্ঠানিকতা বাকী মাত্র’। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের এমন বক্তব্যকে কেউই কাঙ্খিত মনে করছেন না। বরং তার কথার মধ্যে বিরোধীদের অভিযোগের সত্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞমহল। কারণ, গণতন্ত্র ও নির্বাচন কোন আনুষ্ঠানিকতা বা নিয়মরক্ষার বিষয় নয় বরং তা ফুলে-ফলে সুশোভিত করে লালন করতে হয়। এর অন্যথা হলে তাকে গণতন্ত্র বা নির্বাচন বলার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। জনগণ আনুষ্ঠানিকতা বা নিয়মরক্ষার কোন নির্বাচন দেখতে চায় না বরং এমন নির্বাচন চায় যে নির্বাচনে জনগণের মতাতের বাস্তব প্রতিফলন ঘটুক এবং দেশে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হোক। অন্যথায় আমাদের গন্তব্য হবে একেবারেই লক্ষহীন। (ংসসলড়ু@মসধরষ.পড়স)
শীর্ষনিউজ২৪ডটকম