সোমবার, ১০-ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন

মিয়ানমারের উস্কানি কাদের ইশারায়?

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০৪ মার্চ, ২০১৮ ০৮:৫২ অপরাহ্ন

মীর আব্দুল আলীম: রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে না নিয়ে উল্টো বাংলাদেশকে সাংঘর্ষিক বিরোধে জড়ানোর উস্কানি দিচ্ছে মিয়ানমার। অনেকটা হঠাৎ করেই ১ মার্চ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের সেনা ও সামরিক সরঞ্জামসহ শক্তি বৃদ্ধি এবং ফাঁকা গুলি ছোড়া নেহায়েতই উদ্দেশ্যমূলক। এ ধরনের আচরণ মোটেই সৎ প্রতিবেশীসুলভ নয়। এ বিষয়ে মিয়ানমার বলেছে, বাংলাদেশের বিরোধিতা করা তাদের লক্ষ্য নয়। সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন করে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে বলে দাবি করেছে মিয়ানমার। ২ মার্চ মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র দু’দেশের পতাকা বৈঠকে এ কথা বলেন।
বস্তুত গত কয়েক বছর ধরেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি, উসকানি প্রদান ও আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। কয়েকবার দেশটির হেলিকপ্টারের বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন, সীমান্ত ঘেঁষে টহল এবং মাইন স্থাপন, সে সাথে ড্রোন ব্যবহারকে সাংঘর্ষিক বিরোধে জড়ানোর উস্কানি হিসেবেই দেখছে নিরাপত্তা বিশে¬ষকরা। সম্প্রতি সীমান্তে ভারী অস্ত্র নিয়ে টহল দিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। বিপরীতে বাংলাদেশ সবসময় সংযত আচরণ প্রদর্শন করে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে এবং আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যা সমাধানের নীতিতে অটল থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থেকেছে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ অটুট রেখে বিজিবি বরাবরই সংযত আচরণ করে যাচ্ছে।
মিয়ানমারের বারবার উস্কানির বিষয়টিতে বহিবিশ্বেও (অপশক্তির) ইন্ধন থাকাটা কিন্তু অমুলক নয়। গায়ে পড়ে কেন তাঁরা ঝগড়া করতে চায়? যুদ্ধ বাধলেই ফায়দা লুটবে কারা? তা কিন্তু আমাদের সরকারের মাথায় থাকতে হবে। বাংলাদেশের দুর্বারগতিতে এগিয়ে যাওয়া এবং উন্নয়ন অনেকেই কিন্তু ভালো দৃষ্টিতে নেয় না। অনেক রাষ্ট্র বাংলাদেশকে দাবিয়ে রাখতে চায়, তলাবিহীল ঝুড়ি বানিয়ে রেখে করুণা করতে চায় আমাদের। ভিখারি বানাতে চায়। বাংলাদেশকে তারা মিশকিনের দেশের তালিকায় রাখতে চায়। আমাদের এখন ঝগড়া করলে চলবে না। যুদ্ধে না জড়িয়ে কৌশলি হতে হবে বাংলাদেশকে। মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি করতে হবে। দীর্ঘ দিন ধরেই উগ্রপন্থি দেশটি দফায় দফায় যুদ্ধের যে উস্কানি দিচ্ছে তা বুদ্ধিমত্তার সাথে সামাল দেওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সরকারকে ভেবে-চিন্তে তবেই সামনে এগুতে হবে। মনে রাখতে হবে মামদো ভ’ত আমাদের পেছনে লেগে আছে।
মিয়ানমার উস্কানি দিচ্ছে কাদের ইশারায়? দেশটি সীমালঙ্ঘন করছে কাদের নির্দেশে? দেশটি কেন আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি মানছে না? রোহিঙ্গাদের এদেশে চাপিয়ে দিয়ে উল্টো গায়ে পড়ে বাংলাদেশের সাথে ঝগড়া করতে চাইছে তারা। এর অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। বিশ্ব মোড়লদের ইশারাতো আছেই। তা না হলে কোন্ শক্তিতে মিয়ানমারের মতো দেশ বার বার সীমা লঙ্ঘন করছে। এ অবস্থায় উস্কানিমূলক এ ধরনের কাজের জন্য 'অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি' দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে বাংলাদেশ। যুদ্ধে না জড়িয়ে বাংলাদেশের এতটুকু প্রতিবাদ জরুরি ছিলো।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি কেবল প্রতিবাদ করবে? যুদ্ধ করবে? নাকি কৌশলী হবে? কি করবে বাংলাদেশ? অনেকে বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করেন। দেশের কথা ভাবেন না। যুদ্ধ করার কথাও কেউ কেউ বলেন। হয়তো তাঁরা ভেবে বলেন না। নয়তো দুরদর্শীতা নেই তাঁদের। এখানে সরকারকে দোষারোপ করলে হবে না। বিরোধী দল এ নিয়ে রাজনীতি করলে চলবে না। গোটা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের বিষয় এটি। জানমালের বিষয় এটি। দেশের স্বার্থেই সরকার এই ইস্যুতে যুদ্ধ করা ঠিক হবে না। আমিও কিন্তু এ বিষয়ে একমত পোষণ করছি।
কিন্তু কেন? আমরা লক্ষ্য করছি, মিয়ানমার ইস্যুতে বিশ্ব মোড়লরা দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সারা বিশ্বে আজ নানা কারণে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। এক দেন অন্য দেশের সাথে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। এমন সময় কে কাকে সমর্থন করে। আর এ সমর্থনে কে কার বিরোধ করে এনিয়ে সংশয় রয়েছে। কঠিন কোনও সিদ্ধান্তের আগে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশকে আরও কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আমরা দেখেছি এর আগে মিয়ানমারের পক্ষে রাশিয়া ও চিন, ভারত প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে। সৌদি-পাকিস্তান চুপচাপ। পাকিস্তান অস্ত্র বেচেছে মিয়ানমারের কাছে। বাংলাদেশের শত্রু কম নয়। তিন পরাশক্তি প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়া, সেইসঙ্গে পাকিস্থান, সৌদি আরবের রহস্যজনক আচরণে শংকা তৈরি করে বৈকি।
আরেকটি বিষয় কিন্তু বেশ ভাবনার। নিকট অতীতে আমরা জেনেছি, চীন ৮০ ভাগ বিনিয়োগে মিয়ানমারের সমুদ্র বন্দর তৈরি করতে চায়। বরাবরই কথিত আছে, রোহিঙ্গা বসবাসকারী এলাকায় গ্যাসসহ নানা খনিজ সম্পদ রয়েছে। ঐ সীমায় যদি মূল্যবান খনিজ সম্পদ থাকে তবে, নিকটবর্তী হওয়ায় বাংলাদেশের সীমায়ও এমন সম্পদের আশা করা হচ্ছে বহু বছর ধরে। এই অজানা মূল্যবান খনিজ সম্পদ কাল হচ্ছে নাতো? বিষযটি ভেবে দেখতে হবে। তা না হলে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্ব মোড়লদের এত নীরবতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের উপর এতো নিষ্ঠুরতা আর নির্দয়ভাবে বাংলাদেশে তাদের পাঠিয়ে দেয়ার পরও কোন কোন দেশের নিলজ্জ সমর্থন ভাবনায় ফেলে বৈকি! এ অবস্থায় কোনও দেশ মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যুদ্ধ তৈরি করে নিজেরা ফায়দা হাসিল করতে চায় কিনা তাই এখন ভাববার বিষয়।
মিয়ানমারে 'জাতি নির্মূল' এবং সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে রোহিঙ্গারা পালাতে বাধ্য হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এর তীব্র নিন্দা করলেও চীন মিয়ানমারের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেছে। রোহিঙ্গা সংকটকে মিয়ানমারের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ দাবি করে দেশটিতে বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে রাশিয়া। ভারতের অবস্থানও মিয়ানমারের পক্ষে। যদিও দেশটির পরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মমতা ব্যানার্জীর অবস্থান রোহিঙ্গা নিধনের বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা সংকটকে ‘আন্তঃধর্মীয় বিরোধ’ আখ্যা দিয়ে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভার দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, এটি মনে রাখা দরকার যে, একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার ইচ্ছা আন্তঃধর্মীয় বিরোধই কেবল বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি আরও বলেন- মিয়ানমার সরকারের প্রতি আমরা সমর্থন জানাচ্ছি এবং ওই ধর্মের অনুসারীদের প্রতি উগ্রপন্থিদের উস্কানিতে ঝাঁপিয়ে না পড়ার আহ্বান জানাচ্ছি। মারিয়া জাখারোভাকে উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানিয়েছে রুশ বার্তা সংস্থা তাস। বিষয়টি রাশিয়ার হুঁশিয়ারি হিসাবেই নিতে হবে।
এছাড়াও আমরা কি দেখছি? চীন এবং পাকিস্তান মিলে সম্প্রতি মিয়ানমারকে সামরিক সহায়তা করেছে। মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। দুই দেশেই অধিকাংশ মানুষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মিয়ানমারের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। তাই চীন মিয়ানমারের সাথেই থাকছে। অভিযোগ উঠেছে, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানো তো দূরের কথা তলে তলে মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রভাবশালী ডন পত্রিকার সূত্রে জানা যায়, এ বছর ডিসেম্বর মাস নাগাদ পাকিস্তানে তৈরী ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধ বিমানের একটি চালান যাবে মিয়ানমারে। জেএফ-১৭ বিমানটি পাকিস্তান অ্যারোনোটিক্যাল কমপে¬ক্স ও চীনের চেংডু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশনের যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। এই যুদ্ধবিমান ক্রয়কারী প্রথম দেশ হতে যাচ্ছে মিয়ানমার। বিশেষ করে নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম রফতানির প্রয়োজনে মিয়ানমারকে বেছে নিয়েছে পাকিস্তান। মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে অস্ত্র রফতানিকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায় পাকিস্তান। এছাড়াও বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তুরস্ক রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে সরব হলেও নীরব সৌদি আরব। কৌশলগত অবস্থানের জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে চীনেরও সমঝোতা ভালো। চীন প্রতিবেশী পাকিস্তানকে নিজের করে রেখেছে ভারতকে চাপে রাখার জন্য। আর সৌদি আরব তো অনেক আগে থেকেই পাকিস্তানের ধর্মীয় বড় ভাই। তাই সারা বিশ্ব, বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে সরব হলেও মুসলিম উম্মাহর লাঠিয়াল হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের ভূমিকা একেবারেই নীরব। রোহিঙ্গা নিয়ে মোড়ল দুই দেশের নীরবতা স্বাভাবিকভাবেই নীরব করে রেখেছে পাস্তিানকেও। বিষয়টি কতটা জটিল, হিসাব-নিকাষ করলেই তা অনুমান করা যায়।
রোহিঙ্গা ইস্যুটি কিভাবে সমাধান হবে? আসলে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংকট সহজে সমাধান হওয়ার নয়। এর পেছনে শুধু ধর্মই কারণ নয়, অর্থনৈতিক কারণও বটে। কাজেই বাংলাদেশের সামনে রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। এ কাজ শুধু সরকার বা প্রধানমন্ত্রীরই নয়, সারা জাতির এবং দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দলের। এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্যের ডাকের পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে। আমরা যে সংকটে রয়েছি, তার আশু নিষ্পত্তি হবে এমনটা মনে হয় না। সে পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্যও আমাদের তৈরি থাকতে হবে।
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ও তাদের আশ্রয়দান কেবলই মানবিকতার নয়। মানবিকতার দোহাই দিয়ে দেশি-বিদেশী একটি কুচক্রি মহল বাংলাদেশকে ঠেলে দিচ্ছে এক গভীর সংকটে। একদিকে সাম্প্রদায়িক মুসলিম ইস্যুতে তাদের বাংলাদেশে আশ্রয়দানের দাবি তুলছে মুসলমান সম্প্রদায়। অন্যদিকে মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য জাতিসংঘের পেশকৃত প্রস্তাবে চীনের ভেটোকে সমর্থন জানিয়েছে। নীরব ভূমিকায় রয়েছে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের স্ত্রী রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে এসে তাদের দুর্দশা দেখে চোখের জল ঝরিয়েছেন। আবার এই তুরস্কই নির্যাতিত সিরীয় মুসলমানদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত সিলগালা করে দিয়েছিল। বিষয়টি কি দাঁড়ায়? অবশ্যই আমাদের বুঝেশুনে পা বাড়াতে হবে। ভাবতে হবে মিয়ানমার কেবলই মিয়ানমার নয়।
দেখে নেয়া যাক, মিয়ানমারের শক্তির উৎস কোথায়? দেশটির সরকার ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রায় ২০০ গ্রাম মানুষশূন্য করে ফেলেছে। রাখাইনে যেসব গ্রাম অক্ষত রয়েছে, সেখানেও আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরÑ রাখাইনে অলআউট ক্র্যাকডাউন শুরু করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সেখানে একজন রোহিঙ্গাকেও রাখতে চায় না তারা। তাদের লক্ষ্যÑ রাখাইন রাজ্য রোহিঙ্গা মুসলিমশূন্য করা। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যা ও তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। জ্বলছে গ্রামের পর গ্রাম। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বাড়িঘরে আগুন লাগাচ্ছে। নারী-শিশু নির্বিচারে হত্যা করছে। চালাচ্ছে ধর্ষণ। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, রাখাইনে এখন লাশ আর লাশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংগঠনের প্রতিবাদের মুখেও গণহত্যা অব্যাহত গতিতে চলছে। কোথাও কোথাও বাড়ানো হয়েছে তাদের কার্যক্রম। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছেÑ তাদের শক্তির উৎস কোথায়। মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির সরকার ও সেনাবাহিনীর অব্যাহত গণহত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববাসী সোচ্চার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিদিনই বিক্ষোভ হচ্ছে। রোহিঙ্গা গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন নোবেল বিজয়ীরা। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন। এ নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও সোচ্চার। কিন্তু কারো কথা শুনছে না মিয়ানমার। মানছে না কোনো কিছু। বিশ্ব সম্প্রদায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গ্রামের পর গ্রাম জ¦ালিয়ে ছারখার করা হচ্ছে।
এসব করেই ওরা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করছে। বর্তমানে ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের জন্য বোঝা বৈকি! বাড়তি এই জনগোষ্টিকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ? তুরস্কের ফার্স্ট লেডি বাংলাদেশে এলেন আর তাকে অভিনন্দন দেয়াও শুরু হয়ে গেল না বুঝে। পারলে এদেশের কেউ কেউ তাকে নোবেল পুরস্কার দিয়ে দিবে, ভাবে এমনইতো মনে হয়েছে। তারা আজ এতো মানবিক! প্রশ্ন হলো, সিরীয় মুসলিম শরণার্থীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তুরস্ক সেদিন তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছিল কেন? আর তাদের এই ত্রাণে কয়দিন চলবে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা?
মিয়ানমারের আয়তন ৬ লক্ষ ৭৬ হাজার বর্গমাইল ও লোকসংখ্যা ৭ কোটি। আর বাংলাদেশের আয়তন ১ লক্ষ ৪৭ হাজার বর্গমাইল ও লোকসংখ্যা ১৬ কোটি। রোহিঙ্গারা বসতি স্থাপন করছে বাংলাদেশে। মিয়ানমার গোপনে গোপনে তার সামরিক শক্তিও বাড়াচ্ছে। মিয়ানমারের একটিভ সেনা সদস্য ৪ লক্ষ ৯২ হাজার, বাংলাদেশের ৪ লক্ষ ১০ হাজার। মিয়ানমারের ব্যাটল ট্যাংক ৮০০ টি, বাংলাদেশের ৬০০ টি। মিয়ানমারের যুদ্ধ বিমান ১২৮ টি, বাংলাদেশের ৮০ টি। মিয়ানমারের এটাক হেলিকপ্টার ১০০ টি, বাংলাদেশের মাত্র ২৯ টি। মিয়ানমারের যুদ্ধাস্ত্রের সংখ্যা ৭,৪৬,০০০, আর বাংলাদেশের ৫,৪৭,০০০। মিয়ানমারের পক্ষে প্রকাশ্য ভূমিকায় রয়েছে কিছু দেশ। বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়াবে কোন দেশ? এসব বিষয় আমাদের ভাবনায় আনতে হবে।
আসলে যে যাই বলি, যেভাবেই বলি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোই একমাত্র সমাধান। এ জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা জরুরী। নতুন করে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে বহু বছর ধরে রোহিঙ্গা নাগরিকরা এখানে এসেছেন। তাদেরও এদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে হবে। তবে এ কাজটি অনেক কঠিন। এ ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোই একমাত্র সমাধান। এসব মানুষদের শান্তিপূর্ণভাবে সেখানে পাঠানোই হতে পারে একমাত্র সমাধান। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব বিবৃতি দিয়েছেন। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা হয়েছে। এমন আলোচনা বহু বছর ধরেই হচ্ছে কিন্তু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বেদনাদায়ক এবং কষ্টের। এক বৃহৎ  বাড়তি জনগোষ্ঠি লালন-পালন দেশটির জন্য মোটেও সহজ নয়। রোহিঙ্গাদের বার্মায় ফেরত পাঠাতে কুটনৌতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। কারো পাতা ফাঁদে পড়ে যুদ্ধ করে নয় বরং সমঝোতার মাধ্যমে এর সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
শীর্ষনিউজ২৪ডটকম/ওআর