বুধবার, ১৯-সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন

পোড়ো বাড়িতে ভৌতিক পরিবেশে সলিডারি কনফাইনমেন্টে খালেদা জিয়া!

Shershanews24.com

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০৮:৩৫ অপরাহ্ন

আলম মোর্শেদ: আজ ১২ দিন পার হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে জননন্দিত রাজনৈতিক নেত্রী এবং রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান হকদার বেগম খালেদা জিয়া কারান্তরীণ। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে একটি বানোয়াট মামলায় সাজা দিয়ে তাঁকে আড়াই’শ বছরের পুরাতন পরিত্যক্ত কারাগারের একটি ভবনে  বন্দী করে রেখেছে বর্তমান অবৈধ সরকার। ঘটনার দিন থেকে দেশের সর্বমহলে আলোচিত হচ্ছে- খালেদা জিয়া কবে কিভাবে কারাগার থেকে বের হবেন। সচেতন লোকজন তখন ধরেই নিয়েছিল, উচ্চ আদালতে জামিনের দরখাস্ত করলেই স্বাভাবিক নিয়মেই বেরিয়ে আসতে পারবেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এতোদিন পার হলেও কারাগার থেকে বের হওয়া তো দূরের কথা, এখন অবধি জামিনের দরখাস্তই করা যায়নি। কারণ, মামলার রায়ের কপি পেতেই এতোদিন লেগেছে। তথাকথিত রায় পরীক্ষা নীরিক্ষা ও বেআইনী সংশোধনের নামে অনুলিপি দিতে বিলম্ব করা হয়েছে। মিডিয়াতে খবর- রায়ে ভুলভ্রান্তি মেরামতের কাজ করা হয়েছে! যেখানে ৬৩২ পাতা রায় ১০/১২ দিনেই লেখা হয়ে গেছে, এখন সেখানে কেবল কপি করতেই ১২দিন পার হয়ে গেছে। অথচ আইনে বলা আছে, বিচারক পূর্ণাঙ্গ রায় লিখে আদালতে ঘোষণা করতে হবে, এবং সই করতে হবে। রায় ঘোষণার পরে কোনোভাবেই পরে তা বদলানো যাবে না। এই মর্মে অভিযোগ উঠেছে, রায়ের ভেতরে এত বেশি জাল-জালিয়াতি, মিথ্যাচার রয়েছে যে, কপি দেয়া হলে তা প্রকাশ হয়ে পড়বে। তাই ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টায় এগুলো মেরামতের চেষ্টা করা হয়েছে এই ক’দিন।

আসলে যা কিছু হচ্ছে, কোনো আদালত বা বিচার নয়, বরং বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বা সরকার প্রধানের ব্যক্তিগত ইচ্ছা পূরণ করা হয়েছে। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের মতে, নির্বাচন হাসিল এবং ক্ষমতায় যাওয়ার কৌশল। ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী (প্রায় ৮০ভাগ জনসমর্থন যার), ৫টি জাতীয় নির্বাচনে কোথাও না হেরে সর্বোচ্চ ২৩টি আসনে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন যিনি, সেই বেগম খালেদা জিয়া। রাজনীতিতে খালেদা জিয়াকে বড় ভয় সরকারের। কারণ দেশে এখনি নির্বাচন হলে বেগম জিয়া বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে দেশের জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী হবেন, এটা সরকারও জানে। তাই সরকার দেশে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে চাচ্ছে না। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি বিনাভোটের একটি নির্বাচনের উপরে ভর করে ক্ষমতার চেয়ার আঁকড়ে আছেন তিনি। তার ক্ষমতার মূল শক্তি কিছু পুলিশ, র‌্যাব ও দলীয় গুন্ডা। এই নিজস্ব বাহিনী দিয়ে বিরোধী দলের লোকদেরকে অপরহণ, গুম, খুন কারান্তরীণ করে চলেছে হরদম, প্রতিবাদীদের টুটি চেপে ধরেছে। এতকাল বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের উপরে মামলা, হামলা, নির্যাতন করা হলেও ১০ বছরের চেষ্টার পরে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দী করে আওয়ামী লীগ সরকার।
সুস্থ রাজনীতির ধারক বাহক বেগম জিয়া সর্বদা দেশের প্রচলিত আইন কানুন মেনে চলেন। প্রতিহিংসা নয়, সমঝোতার রাজনীতি করার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অবরোধ-হরতাল, জ্বালাও পোড়াও করে এমনকি নিজে আগুণ দিয়ে গাড়ি পুড়িয়ে, গান-পাউডার দিয়ে দোতলা বাস জ্বালিয়ে মানুষ হত্যা করে সমাজে বিভীষিকা তৈরী করে নিজেদের চাহিদা পুরণ করেছে আওয়ামী লীগ। আবার অন্যের ডাকা হরতালে বোমাবাজি ও আগুণ দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করে বিপক্ষ দলকে দায়ী করতে আওয়ামী লীগের জুড়ি মেলা ভার। গত এক দশক আওয়ামী লীগ এভাবেই ক্ষমতা দখলে রাখার পরে এবারে যখন তা হারানোর উপক্রম হয়েছে, তখনই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়াকে ছলে বলে কলে কৌশলে অনুগত আদালত ব্যবহার করে কারাবন্দী করেছে। এর আগে দু’জন প্রধান বিচারপতিকে পর পর জোরজবরদস্তিমূলক অপসারণ করে বিচারকদের দন্ডমুন্ডের কর্তৃত্ব হাতে নিয়েছেন তারা, তারপরে এক জুনিয়ার জজকে দিয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এই বানোয়াট রায় ঘোষণা করেছেন। ঠিক যেনো সিনেমার গল্প। মসনদের প্রধান দাবীদারকে গারদে পুরে নিত্য অত্যাচার করে মনের ঝাল মেটানোর কাহিনী! অবৈধ সরকারের ইচ্ছে হলো, যে কোনো কৌশলে তাঁকে আটকে রাখতেই হবে। আজ বৃহস্পতিবার ১২ দিন পার হওয়ার পরেও সেই তাগুদি রায়ের কপি দেয়া হয়নি অবৈধ সরকারের ইচ্ছায়, যাতে করে জামিনের দরখাস্ত না করতে পারেন খালেদা জিয়া। হয়ত এর অন্তরালে রয়েছে আরও কোনো কুবুদ্ধি।
বিনাভোটের পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীর ফুফাত ভাই শেখ সেলিম প্রচন্ড দম্ভের সাথে ঘোষণা দেন, “খালেদা জিয়াকে ডিভিশন জেলে নয়, রাখা হবে ফাঁসির আসামীদের কনডেম সেলে!” যদিও ৭দিন সাধারণ বন্দী হিসাবে রাখার পরে জেল কর্তৃপক্ষ থেকে অবশেষে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়াকে এখন প্রথম শ্রেণীর বন্দী হিসাবে রাখা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তাঁকে বন্দী রাখা হয়েছে জনমানবহীন বিশাল এলাকায় এক নির্জন পরিত্যক্ত বাড়িতে। হরর সিনেমার পোড়োবাড়িতে নির্জন পরিবেশে বিশাল এলাকায় দিনের বেলায় কাকের কা কা শব্দ, আর রাত হলেই নামে নির্মম নির্জনতা। এটা কারাগার নয়, সলিডারি কনফাইনমেন্ট। দু’শ বছরের বেশি বয়সী পরিত্যক্ত এ জেলখানায় আর কোনো বন্দী নেই। কেবল খালেদা জিয়া! তাছাড়া এটি এখন আর কোনো জেলখানা নয়, বরং পরিত্যক্ত ভবন, যেকোনো সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে। এটাকে অঘোষিত বন্দিশালাও বলা যেতে পারে। সরকারি প্রজ্ঞাপণ দিয়ে এটি সাবজেল ঘোষণা করা হয়নি এখনও। যার অর্থ দাঁড়ায়- এ কারাবাস অবৈধ! অবৈধ সরকারের ইচ্ছাতেই পরিত্যক্ত বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছে ৭৩ বছর বয়েসী নারী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে, যিনি নানা অসুস্থতায় ভুগছেন। দু’টি হাটু বদলানো, তীব্র ব্যথায় হাটতে পারেন না, বিশেষ ধরনের সেবাযতেœর দরকার হয়, যার কোনো ব্যবস্থা নেই সেখানে। ওই ভবনের আশে পাশেই রয়েছে শত শত বছরের ফাঁসির কাষ্ঠ, যেখানে মৃত্যু ঘটেছে শত শত মানুষের, যা ভৌতিক অবস্থাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ১৭ একর জমির উপর নির্মিত ছোট বড় লাল লাল পুরোনো বিল্ডিং, চারিদিকে উঁচু প্রাচীর দেয়া, যেখানে বাস করে নির্জনতা আর ভুত প্রেত! নির্জন নির্বাসনে গা ছম ছম করা পরিবেশ। বিশাল মহিলা ওয়ার্ডজুড়ে ভয়াবহ মশার উৎপাত, নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় নেই। এটা নাকি ডিভিশন জেল! বাস্তবে ডিভিশন দেয়ার মত কোনো ব্যবস্থা ওখানে নেই। সরকার প্রধান ইচ্ছা করেই তার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাকে কেবল জেলের কষ্ট দিয়ে নয়, মানসিক টর্চার করে নিজের মনের ঝাল মিটাচ্ছেন।

নাজিমুদ্দিন রোডের এই অঘোষিত অবৈধ জেলখানায় বন্দী রাখা হয়েছে বাংলাদেশের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম জিয়াকে- কারাগারের নামে সেখানে চলছে ভয়াবহ মানসিক টর্চার। শ্রেণীপ্রাপ্ত জেলখানার কোনো সুযোগ সুবিধা নেই সেখানে। তারপরও ‘বিশেষ বন্দী’ নাম দিয়ে অবৈধ সরকার এই প্রহসন চালিয়ে হচ্ছে। জনমানবশূন্য এই বিশাল পোড়োবাড়িতে বন্দী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর ধারেকাছে কাউকে যেতে দেয়া হয় না। খাবার দাবার দিতে সেখানে কেউ গেলেও তাদের কথা বলা নিষেধ। এ এক ভয়াবহ নির্যাতন, প্রায় কনডেম সেলে থাকার মতো। জেলখানায় সাধারণ বন্দীরাও এর চেয়ে মানবিক পরিবেশে থাকে। ৭০ বছর বয়স্ক এই সিনিয়র সিটিজেন নারীর প্রতি যে সহিংসতা চলছে, তার অতীত নজীর খুঁজে পাওয়া দুস্কর। জেলখানার পরিবেশ সম্পর্কে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অভিযোগ করেন, বেগম খালেদা জিয়াকে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছে। সেখানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে না। একটি পরিত্যক্ত ভবনে তাকে রাখা হয়েছে। যেখানে কোনও মানুষ নেই, অন্য আসামিও নেই। যেভাবে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্তদের নির্জন কারাবাসে রাখা হয়, সেভাবেই তাকে রাখা হয়েছে।
এর আগে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় বসেই ২০১০ সালের আগস্ট মাসে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাভারের জমি ও দোকানপাট আ’লীগের দলীয় লোকজন দিয়ে দখল করে নেন। ঐকাজেও ব্যবহার করা হয় একটি কনিষ্ঠ জজ আদালতের গোপন ত্রুটিপূর্ণ মতলবি রায়। ওই সময় বৃহস্পতিবার নাকি কে বা কাহারা রায় পেয়েছে, শুক্রবার ছুটির ফাঁদে ফেলে শত শত পুলিশ দিয়ে ভাঙচুর করে খালেদা জিয়ার জমি বুঝিয়ে দেয়া হয় এক আওয়ামীলীগ নেতাকে। এর দু’মাস পরে আবার আদালতের রায়ের কথা বলে খালেদা জিয়াকে টেনে হেঁচড়ে জোর করে বের করে দেয়া হয় দীর্ঘ ৩৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত ক্যান্টমেন্টের শহীদ মইনুল রোডের নিজস্ব বাড়ি থেকে, যদিও সে মামলার আপিল বিচারাধীন ছিল। তখন বেগম জিয়াকে তার আইনজীবীদের সাথে কথা বলতেও দেয়া হয়নি। আইনজীবীরা ক্যান্টনমেন্টে ঢুকতে চাইলে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। খুব দ্রুতই খালেদা জিয়ার বাড়ি মাটির সাথে গুড়িয়ে দেয়া হয়। এভাবে আদালতের দোহাই দিয়ে বলপ্রয়োগ করে বাড়ি ঘর, জমি জিরাত থেকে উৎখাত করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বেগম জিয়াকে অবশেষে পরিত্যক্ত পোড়োবাড়িতে বন্দী করে রেখে সরকার তাদের জিঘাংসা প্রতিহিংসার উৎকট রূপ প্রকাশ করছে। তবে এই জুলম ও অবিচার কর্মকা- দেশের মানুষ গ্রহণ করেনি, বরং উল্টো খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতি বাড়ছে। এমনকি আওয়ামীলীগের বহু লোক মনে করছে, এ ধরনের প্রতিহিংসা ছড়ানো উচিত নয়।
তবে, আপাতত খালেদা জিয়ার রায়ের আপিলের দিকে তাকিয়ে আছে দেশের কোটি কোটি মানুষ। দিনে দিনে মানুষের আগ্রহ ও সহানুভুতি এমন ভাবে বাড়ছে যে, এটা এখন কোনো ব্যক্তির মামলা বা আপীল নয়, বরং কোটি কোটি জনতার প্রতিকার চাওয়া। অবৈধ সরকারের নিয়মবহির্ভুত অন্যায় কার্যকলাপে জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে গেলে আর রক্ষা পাবে কেউ।
শীর্ষনিউজ২৪ডটকম/ওআর