সোমবার, ১০-ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন

‘অরি মারি পারি যে কৌশলে’

Shershanews24.com

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০৭:৪১ অপরাহ্ন

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা: রাজনীতিতে বিস্তর মতপার্থক্য থাকলেও অতীতে রাজনীতিবিদদের পরষ্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও শিষ্টাচার লক্ষ্য করা যেত। তারা ভিন্নমতকে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবেই বিবেচনা করতেন। কখনো তা ব্যক্তিগত আক্রোশ বা প্রতিহিংসার পর্যায়ে যেত না। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অহেতুক খিস্তিখেউর করতে কাউকে দেখা যায় নি অতীতে। রাজনৈতিক মঞ্চে একে অপরের তুলোধুনো করলেও তা কারো ব্যক্তি চরিত্র হননের অনুসঙ্গ হতো না। একে অপরের  সমালোচনা করলেও তা করা হতো গঠনমূলক প্রক্রিয়ায়। ভিন্নমত ছিল দেশ ও জাতির স্বার্থের অনুকুলে। কিন্তু হালে সে অবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। শ্রদ্ধা ও শিষ্টাচারের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে কদর্যতা ও ক্ষমতালিপ্সা। যা আমাদেরকে রীতিমত অস্তিত্ব সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
আমাদের দেশের একশ্রেণির রাজনীতিক গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক পরিসরের মধ্যে অবস্থান না করে সীমালঙ্ঘনের পথ বেছে  নিয়েছেন। খুব প্রসঙ্গক্রমেই রাজনীতিতে সহাবস্থান ও পারষ্পরিক শ্রদ্ধার পরিবর্তে এখন তা  সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই তারা এক পক্ষ অপর পক্ষের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। একটা অনাকাঙ্খিত অবিশ্বাস তাদেরকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে। সঙ্গত কারণেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা হয়ে ওঠেছেন একেবারে জান-প্রাণের শত্রু। প্রাসঙ্গিকভাবেই যেকোন মূল্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নামে কথিত অসুর বধই হয়েছে আমাদের দেশের রাজনীতির প্রধান উপজীব্য। ‘অরি মারি পারি যে কৌশলে’ এই হয়েছে আমাদের দেশের রাজনীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। ফলে দেশে সুস্থ্যধারার রাজনীতি সরল রেখাটা ক্রমেই বক্র হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থার কোন উন্নতি দৃশ্যত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বরং দিন যতই যাচ্ছে ততই পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির যথাযথ চর্চার অভাব, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অশ্রদ্ধার কারণেই আমাদের দেশের রাজনীতি এখন রীতিমত সমস্যাসঙ্কুল হয়ে উঠেছে। আর আগামী দিনে এই পরিস্থিতিটা আরও বাড়বে একথা বলার যৌক্তিকতাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দীন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন। অপরাধীর বিচার ও দন্ডাদেশ নিয়ে কোন মন্তব্য করা মোটেই কাঙ্খিত, সঙ্গত ও যৌক্তিক নয়। এতে দেশের বিচার বিভাগের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু যেকোন বিচার প্রক্রিয়া অন্তত স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত। অথচ এ ক্ষেত্রে সরকার খুব একটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে হয় না।
মূলত আইনের ভাষাই হচ্ছে অপরাধী প্রয়োজনীয় সাক্ষী-প্রমাণ ও দলিল-দস্তাবেজের অভাবে ছাড়া পেয়ে গেলে সমস্যা নেই। অর্থাৎ যেকোন সন্দেহের সুবিধা আসামী পক্ষ পাবেন বলেও আইনে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু কোন অবস্থাতেই যেন নিরাপরাধ ব্যক্তি শাস্তির সম্মুখীন না হন এই বিষয়টি বিচার প্রশাসনের মাথায় রাখা জরুরি। তাই কোন বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে তখন সে বিচার প্রক্রিয়ার যথার্থতা প্রমাণের আবশ্যকতাও দেখা দেয়। বেগম জিয়ার বিচারের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেছে বলেই মনে হচ্ছে এবং বিচার  প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে গেছে। এমনকি এই বিচারে সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলারও সুযোগ করে দিয়েছে সরকার সংশ্লিষ্টরাই।  যা আইনের শাসনের জন্য কোন সুখবর নয়।
এ প্রসঙ্গে বাতাসে নানা কথা ভেসে আসছে। বলা হচ্ছে, এ সরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। যেখানে সরকারপন্থিরা জড়িত থাকার প্রমাণ থাকলেও তাদেরকে কখনো গ্রেফতার বা বিচারের আওতায় আনা হয়নি। সেখানে দুই কোটি টাকার মামলায় বেগম জিয়ার সাজা হয়েছে। অথচ সে টাকা এখনো ব্যবহারই করা হয়নি। অর্থাৎ নালিশি অর্থ আত্মসাতের কোন ঘটনা ঘটেনি বলে বিবাদী পক্ষ দাবি করছেন। এর কোন সদুত্তর সংশ্লিষ্টরা এখনও দিতে পারেনি।
আসলে সরকার যদি মনে করে, দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপের অংশ হিসেবেই বেগম জিয়ার সাজা হয়েছে। তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে এটা আরো হাস্যকর হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ যে সময়ে এই মামলা হয়েছে সে সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও অনেকগুলো মামলা হয়েছিল। একই সময়ে বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো চলমান থাকলেও ক্ষমতায় থাকায় প্রধানমন্ত্রীর সব মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাই বেগম জিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করে অন্যদেরকে ধোয়া তুলসী পাতা আখ্যা দেয়ার সুযোগ খুব একটা থাকছে না বা এমন কথা কেউ গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছে না।
বেগম জিয়ার যে মামলায় দন্ডাদেশ দেয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়েছিল ১/১১ পরবর্তী জরুরি সরকারের আমলে। সে সময় বর্তমান ক্ষমতাসীনদের  বিরুদ্ধে মামলার বহরটা মোটেই সংক্ষিপ্ত ছিল না। এমনকি জরুরি সরকার অনেক বড় বড় মামলা দায়ের করে ছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। মামলায় হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও ছিল সেসব মামলায়। কিন্তু  আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নেতাদের বিরুদ্ধে থাকা সকল মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অবশ্য সরকার পক্ষ দাবি করছে যে, তাদের শীর্ষনেতার বিরুদ্ধে মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেয়া হয় নি বরং মামলাগুলো উচ্চ আদালতে কোয়াশড হয়েছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার যৌক্তিকতাও রয়ে গেছে।
প্রসঙ্গত, বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলো দুদক যত গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করেছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধের মামলাগুলোতে কোয়াশ পিটিশন দায়েরের বিরুদ্ধে দুদক জোরালো ভূমিকা তো দূরের কথা, বরং তারা কোয়াশের বিরোধিতাও করেনি।  এখানেই দুদকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগটা থেকেই যাচ্ছে। সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছেন যে, দুদক বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো যত গুরুত্ব দেয়, সরকারি দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপারে ততটাই উদাসীন। তাই বেগম খালেদা জিয়ার বিচারের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের জন্য এ ধরনের সকল মামলারই গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি করা জরুরি বলে মনে করছেন অভিজ্ঞমহল। অন্যথায় বেগম জিয়ার বিচারের উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক মোটেই পিছু ছাড়বে না।
সরকার পক্ষ দাবি করে আসছে যে, বেগম জিয়ার মামলা ও দন্ডাদেশের বিষয়ে সরকারের কোন হাত নেই বরং আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তার দন্ডাদেশ হয়েছে। তারা আরও দাবি করছেন যে, অপরাধী যে-ই হোক না কেন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এ কথার মধ্যেও শুভঙ্করের ফাঁফি রয়েছে বলেই মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ, বিগত জরুরি সরকারের আমলে শুধু বিরোধী দল নয়, সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতি মামলা হয়েছিল। সেসবের বিচার এখন পর্যন্ত সরকার শুরুই করতে পারেনি, বরং কথিত রাজনৈতিক মামলা বিবেচনায় অধিকাংশ মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। যা দেশে আইনের শাসনের জন্য মোটেই সহায়ক নয়।
বর্তমান সরকারের আমলে অনেক বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনাও ঘটেছে। দেশের শেয়ার মার্কেট লুট, ডেসটিনি, সোনালী বাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মত ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে এ সরকারের আমলেই। এসব ঘটনার সাথে সরকার ঘরানার লোকরাই জড়িত বলে মনে করা হয়।  
কিন্তু সেসব আর্থিক কেলেঙ্কারির কোন বিচার হয়নি বা হবে বলেও দেশের মানুষ আস্বস্ত হতে পারছেন না। তাই বিচার বিষয়ে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ নিয়ে এমন মাতামাতিকে কেউই স্বাভাবিক মনে করছেন না। বরং রায়ের বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের অবাঞ্চিত হস্তক্ষেপকেই বড় করে দেখছেন মানুষ। এ প্রসঙ্গে কেউ কেউ মানি লন্ডারিং মামলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক জিয়াকে খালাস দেয়া বিচারক মোতাহার হোসেন ও সরকারের বিরুদ্ধে রায় প্রদানকারী সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অনাকাঙ্খিত পরিণতির কথাও উল্লেখ করে দাবি করেছেন যে, বিচারকের ইচ্ছা থাকলেও তার পক্ষে সরকারের ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। ফলে দেশের সাধারণ মানুষ মনে করছে যে, সরকার আগামী নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করার জন্যই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ময়দান ছাড়া করতে চায়। আর সেজন্যই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিচারের মুখোমুখী দাঁড় করিয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার দন্ডাদেশ পরবর্তী তার সাথে সরকারের আচরণ নিয়েও নানাবিধ প্রশ্ন উঠেছে। দেশের এত ভাল ভাল ও আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন কারাগার থাকতে তাকে নাজিম উদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারে কেন নেয়া হয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে জেলকোড অনুযায়ী ডিভিশন না দিয়ে কেন সাধারণ বন্দীর মতো রাখা হলো তা নিয়ে সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে। রায়ের আগেই নাজিম উদ্দীন রোডের পরিত্যক্ত কারাগার খালেদা জিয়ার জন্য প্রস্তুত করার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দেশের বুদ্ধিজীবীমহল, সুশীল সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। আর ভিকটিম পক্ষ তো বিষয়টিকে নিয়ে সরকারের মুন্ডুপাত করেই যাচ্ছে। যা সরকারের পাওনা বলেই মনে করছেন সচেতনমহল।
সরকার বিভিন্ন মহলের এসব যৌক্তিক সমালোচনাকে স্বাভাবিকভাবে নেয় নি বরং ক্ষেত্র বিশেষে অতিপ্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। যা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের গুরুতর লঙ্ঘন বলেই মনে করা হচ্ছে।  সরকারি দলের কোন কোন নেতা আবার এমন প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছেন, যা কোন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যেই পড়ে না। বেগম জিয়ার দন্ডাদেশ দেয়ার পর তার দল জেলকোড অনুযায়ী একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম জাতীয় সংসদে বলেছেন, গোটা জেলখানাই ওনাকে দেওয়া হয়েছে। এত সুন্দর একটি বাড়ি, আরাম আয়েশে আছে। আরও বলা হয় ওনাকে ডিভিশন দেওয়া হয়নি, অমুক দেওয়া হয়নি। ওনাকে ফাইভ স্টার হোটেল সোনারগাঁওয়ে রাখা হবে? চুরি করে টাকা আত্মসাৎ করেছে, ওনাকে কনডেম সেলে রাখা উচিত। তিনি আরও বলেন, সুযোগ থাকলে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় খালেদা জিয়াকে এক নম্বর আসামি করা এবং জ্বালাও-পোড়াও করে মানুষ হত্যার দায়ে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দিয়ে বিচার করা উচিত।
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেছেন, তোরা গণতন্ত্রকে হত্যা করে সামরিক শাসক দিয়ে পাঁচ বছর দেশ চালিয়েছিস। বিএনপি কথায় কথায় বলে গণতন্ত্র নাই। গণতন্ত্র আছে বলেই-তো তোরা কথা বলতেছিস। ওই যে কথা বলতেছিস, টেলিভিশনে সরকারের বিরুদ্ধে ঘেউ ঘেউ করিস, মিথ্যা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করিস।
শেখ ফজলুল করিম ক্ষমতাসীন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বর্ষীয়ান সাংসদ। তাই তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মন্তব্য করতে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত ছিল বলেই মনে করছেন বোদ্ধামহল। তিনি বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে টাকা মেরে খাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। কিন্তু এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। তাই বেগম জিয়াকে এখনই অপরাধী আখ্যা দিয়েটা সঠিক হয়েছে বলে মনে হয় না। তিনি তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মন্তব্য করার সময় ‘তুই-তকারী’ ও ‘ঘেউ ঘেউ’ শব্দ ব্যবহার করে নিজের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। যা তার ব্যক্তিত্ব ও পদমর্যাদার সাথে সঙ্গতিহীন বলেই মনে করা হচ্ছে।
মূলত গণমানুষের কল্যাণেই আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্র যাতে সুচারু রূপে চলে এবং নাগরিকদের সকল অধিকার নিশ্চিত হয় সে জন্যই সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন আর সরকার পরিচালনার জন্য একদল নিবেদিত প্রাণ মানুষের প্রয়োজনীয়তা থেকেই রাজনৈতিক দলের উৎপত্তি। আর রাজনৈতিক দলের  উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যই হচ্ছে সর্বজনীন স্বার্থ সংরক্ষণ। তাই রাজনৈতিক দলের সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে এডমান্ড বার্ক ( Burke ) বলেন, ‘  A body of men united together for promoting by their joint endeavors the national interest upon some particular principles on which they are all agreed.’
অর্থাৎ কতকগুলো লোক যখন তাদের সমবেত চেষ্টার দ্বারা সর্বজনীন স্বার্থ অর্জনের উদ্দেশ্যে কতকগুলো নীতি সম্পর্কে একমত হয়ে  সংঘবদ্ধ হয়, তখন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়।
আসলে রাজনৈতিক দলের মহতি উদ্দেশ্য থাকলেও আমাদের দেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমরা বোধহয় সে লক্ষ্য অর্জনে পুরোপুরি সক্ষম হয়নি। রাজনৈতিক দলের অন্যতম দায়িত্ব হলো দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এ ক্ষেত্রে অনেকটাই উদাসীন বলেই মনে হয়। তারা মুখে গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রিক মূল্যবোধের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলনটা একেবারেই গৌণ। প্রকৃত গণতন্ত্রীদের গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কোন সুযোগ নেই। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক লিকক (Leacock) বলেন, ÔFar from being in conflict with the theory of democratic government, party government is the only thing which renders it feasible.’
অর্থাৎ রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের বিরোধী হওয়া তো দূরের কথা, দলীয় সরকার গণতন্ত্রের সফলতা দান করে।
আমরা দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করলেও রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনে আমরা পুরোপুরি সমর্থ হয়নি। মূলত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের দেশের গণতন্ত্রের ছন্দপতন শুরু হয়েছে এবং এ ধারা এখন অব্যাহত আছে। তাই দেশ ও জাতিকে আবারও ছন্দে ফিরিয়ে আনতে হলে দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই। একই সাথে দেশে আইনের শাসনও প্রতিষ্ঠা হওয়া দরকার। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবেই বিচার করতে হবে। তাদেরকে একেবারে জান-প্রাণের শত্রু মনে করে যেকোন পন্থায় নির্মূল করার অভিপ্রায়ের মধ্যে কোন কল্যাণ দেখা যায় না। বরং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক হানাহানিই বৃদ্ধি পায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবেই মোকাবেলা করতে হবে। অন্যথায় রাজনীতি আগামী দিনে আরও সংঘাতময় হবে বলে মনে হয়।
গণতন্ত্র সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ হলেও নেচিবাচক রাজনীতির কারণেই সে পথটা এখন খুব মসৃন নয়। বরং ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে এই পথকে। ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা গণতন্ত্রে স্বীকৃত হলেও সে আদর্শ খুব একটা অনুসৃত হতে দেখা যাচ্ছে না। আর এই জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সম্পর্কে অপর পক্ষের  মুখ থেকে অবলীলায় বেরিয়ে আসছে ‘তোরা কথা বলিস’ ‘ঘেউ ঘেউ করিস’। আমাদের দেশের রাজনীতির যে বারোটা বেজেছে এটিই তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তাই এ বৃত্ত থেকে যত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসা যায় ততই কল্যাণ। ‘অরি মারা’র রাজনীতি কখনো কল্যাণকর হয় না। (smmjoy@gmail.com,  ঢাকা-১৭ ফেব্রুয়ারি/ ২০১৮ইং)
শীর্ষনিউজ২৪ডটকম/ওআর