বুধবার, ১৯-সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন

আমার কৈফিয়ত!

Shershanews24.com

প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ১০:০৭ অপরাহ্ন

শামসুল আলম: রাজনীতি রাজনীতির যায়গায় থাকা ভালো, এটা সব যায়গায় টানাটানি করা অনুচিত। সত্য এবং মিথ্যা এক জিনিষ নয়। সত্যকে কখনই মিথ্যা বানানো যায় না। মিথ্যা দিয়ে সত্যকে ঢাকা যায় না। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট সংক্রান্ত একটি বানোয়াট মামলার রায়ে তিন বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এখন কারান্তরীণ। বর্তমান ক্ষমতাসীন অবৈধ সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য পদাধিকারীরা জোরছে আওয়াজ করে বেড়াচ্ছেন- “খালেদা জিয়া এতিমের টাকা চুরি করে খেয়েছেন, তাই তার জেল হয়েছে।” বিনা ভোটের (অবৈধ) সংসদের সদস্যরা সংসদ অধিবেশনে এমন কথাও বলছেন- “তাঁর রাজনীতি শেষ করে দেয়া হয়েছে, তিনি আর কখনও নির্বাচন করতে পারবেন না, ক্ষমতায় আসতে পারবেন না”! ৭৩ বছর বয়স্ক একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ২’শ বছরের পুরাতন এক নির্জন এলাকার পরিত্যাক্ত বাড়িতে সলিডারি কনফাইনমেন্টে রাখার পরেও কত প্রতিহিংসা জিঘাংসার উৎকট রূপ দেখল জাতি! এরা নাকি রাজনীতিবিদ! খালেদা জিয়া দুর্নীতি করেছেন, কি করেননি সে প্রশ্নের উত্তরে পরে আসছি। তবে বিনাভোটের সংসদে যে কথা বলা হয়েছে “খালেদা জিয়ার রাজনীতি শেষ করে দেয়া হয়েছে”- এটাই বোধ হয় বর্তমান ক্যাচালের আসল টার্গেট। সত্য উদঘাটন বা ন্যায় বিচার করা নয়, বরং রাজনীতি খাওয়াই এদের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এভাবে মিথ্যা চাপিয়ে দিয়েই কি কারও রাজনীতি খাওয়া যায়?

প্রথমেই নিজের পরিচয় দিয়ে নিই। যে সময়কার ঘটনা ১৯৯১ সালে ৯ জুন, আমি তখন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে সহকারী সচিব পদে কর্মরত। ঐ অফিসের তখন মাত্র ৮ জন সরকারী কর্মকর্তা ছিলাম আমরা। ভারপ্রাপ্ত সচিব কামাল সিদ্দিকী, সাবিহউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর পিএস-১, উপসচিব ম. সাফায়েত আলী (মরহুম), এম এ মোমেন প্রধানমন্ত্রীর এপিএস, তাজুল ইসলাম তথ্য অফিসার, তিনজন সহকারী সচিব আবদুজ জাহের (৮২ ব্যাচ, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব), আমি নিজে শামসুল আলম, এবং আলী আহমেদ। আমাদের অফিস ছিল বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১ নম্বর বিল্ডিংয়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বসতেন চার তলার অফিস কক্ষে (সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের অফিস), আমরা বসতাম দোতলায়।

তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান (মরহুম) বিদেশ সফর ঘুরে কুয়েতের আমিরের নিকট থেকে একটি ফান্ড আনেন শহীদ জিয়ার নামে এতিমখানা বানানোর উদ্দেশ্যে। কুয়েতের আমিরের সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের হিসাব হতে প্রেরিত ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলারের ডিডিতে “প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল” লেখা ছিল বটে, কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ সরকারের ঐরূপ কোনো ফান্ড ছিল না। ওটা একটা বেসরকারী অনুদান হওয়ার পরেও প্রেরকের ভুলের কারণে ঐরূপ হয়। ভারপ্রাপ্ত সচিব কামাল সিদ্দিকীকে ঐ ডিডি দেয়া হলে তিনি তা ভাঙানোর নিমিত্ত সোনালী ব্যাংক রমনা শাখায় একটি চলতি হিসাব খুলেন। পরে ঐ টাকা (৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা) তুলে সেভিংস/এসটিডি/এফডিআর হিসাব খোলা হয়। ১৯৯৩ সালে সুদসহ সমুদয় তুলে পুরো টাকাটা ২ কোটি ৩৩ লাখ করে সমান দু’ভাগ করে এতিমখানা নির্মানের নিমিত্ত বাগেরহাট এবং বগুড়ায় দুটি ট্রাস্টকে প্রদান করা হয়। এই চেক দু’টিতে সই করেন একাউন্ট হোল্ডার কামাল সিদ্দিকী। এর আগে দু’টি ট্রাস্ট গঠন ও রেজিষ্ট্রি সম্পন্ন হয়। বাগেরহাটের জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সেটেলার হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, এবং বগুড়ার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের সেটেলার হন তারেক রহমান। বাগেরহাটে মোস্তাফিজুর রহমান সাহেব জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে এতিমখানা নির্মান করে যথারীতি পরিচালনা করেন। দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা নূর আহমেদ ১১/৬/২০০৮ তারিখে জমা দেয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ট্রাস্টটি বেসরকারী ট্রাস্ট, এবং “বর্ণিত ট্রাস্টের নামে একটি এতিমখানা স্থাপন করা হয়েছে, যা চলমান রয়েছে বিধায় প্রাথমিক অনুসন্ধানে উক্ত ট্রাস্টের কোনো অর্থ আত্মসাতের কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে দুদকের মামলার অভিযোগকারী এবং তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদও তা মেনে নেন। ফলে বাগেরহাটের এই খন্ড নিয়ে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করা হয়নি বা মামলাও হয়নি (এটা মাথায় রাখবেন)।

এবারে বগুড়ার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট নিয়ে আলোচনা। বগুড়ার জন্য বরাদ্দ করা ২.৩৩ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় ট্রাস্টের নামে বগুড়াতে ২.৭৯ একর ধানি জমি ক্রয় করা হয়। বাদ বাকি সব টাকা ট্রাস্টের একাউন্টে আছে, তা স্বীকার করেছেন মামলার বাদী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ। ট্রাস্টির সদস্যদের কর্মব্যস্ততার কারনে এই টাকা ব্যবহার করে এতিমখানা নির্মান করা হয়নি সত্য, তবে তারেক রহমান এতিমখানার ঐ টাকাকে উচ্চ মুনাফাধারী বিভিন্ন ব্যাংকে রেখে তা তিন গুণ বর্ধিত করেন। ট্রাস্টের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাদের পরিচিত সলিমুল হক কামালকে দায়িত্ব দেন ঐ টাকা ব্যাংকে রাখার জন্য। কামাল সাহেব তার নিজের নামে এবং তার পরিচিতি গিয়াসউদ্দিন ও সৈয়দ আহাম্মদ নামে এফডিআর করে পরে লাভ সহ ভাঙ্গিয়ে সম্পূর্ন টাকা ট্রাস্টের একাউন্টে জমা করা হয়।

২০০৬ সালে এতিমখানার জন্য ঢাকার কাছে আশুলিয়ায় জমি কেনার উদ্দেশ্যে জনৈক শরফুদ্দিনের সাথে বায়না করে ২টি এফডিআর মূলে অর্থ দেয়া হয়, যাতে মেয়াদান্তে ২.৫০ কোটি পাওয়ার কথা। কিন্তু ১/১১র পরে দেশে ধরপাকড় ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতিতে এবং পরে তারেক রহমান গ্রেফতার হলে ঐ জমির রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হয় নাই। ফলে শরফুদ্দিন উক্ত এফডিআর ভেঙে ২.১০ কোটি টাকা ট্রাস্টকে ফেরৎদান করে। মূলত এটাই হলো মামলার ২.১০ কোটি টাকার  উৎস। বাস্তবে ট্রাস্টের কাছে এখনও ৬ কোটির বেশি টাকা আছে ব্যাংকে। এখানে দু্নীতির মামলা হলে ৬ কোটির জন্যই হওয়ার কথা। আর কুয়েতি অনুদান সংক্রান্তে মামলা হলে ১২.৫৫ লাখ ডলার বা ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকার উপরে হওয়ার কথা। এর একটিও হয়নি। অর্থাৎ মামলাটি বস্তুনিষ্ট হয়নি, বরং বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের উদ্দেশ্যে দায়ের করা!

মামলার শুরুতে অভিযোগ আনা হয় যে, অরফানেজ ট্রাস্টের টাকা আত্মসাত করা হয়েছে, যা শেখ হাসিনার ভাষায় ‘এতিমের টাকা চুরি করা’। পরে আদালতে সাক্ষ্য প্রমানাদিতে যখন প্রমান হয় যে, কোনো টাকা কেউ আত্মসাৎ করেনি, তারপরে সরকারী পক্ষ সেটি ঘুরিয়ে দেয় অন্য দিকে- সরকারী তহবিলের অর্থ ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রাইভেট টাস্টকে দেয়ার অভিযোগ আনে, এবং সেই কারন দেখিয়ে বানোয়াট কাগজপত্র ও সাক্ষী দিয়ে ধারণার বশবর্তী হয়ে বেগম জিয়াকে সাজা দেয়া হয়। অবশ্য এর বহু আগে থেকে দেশের ম্যান্ডেটহীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন স্থানে বলতে থাকেন, “এতিমের টাকা চুরি করেছে” (যা পরে কখনই প্রমান হয়নি যে, টাকা চুরি হয়েছে)! বুঝতে কষ্ট হয় না যে, শেখ হাসিনার মুখ রক্ষা করার জন্যই এই রায় ঘোষণা। তাছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়ে পড়েছে- এই রায় কিভাবে শেখ হাসিনার নির্দেশে দেয়া হয়। রায়ের দু’সপ্তাহ আগে আইনমন্ত্রীর অফিসের বরাতে খবর ছাপা হয় খালেদা জিয়ার কয় বছর জেল দিতে চান মন্ত্রী আনিসুল এবং নৌমন্ত্রী শাজাহান খান ২/৩ দিন আগেই মিডিয়াকে বলে- খালেদা জিয়ার কয় বছর জেল হবে! এর আগে সুপ্রিম কোর্টের দু’জন প্রধান বিচারপতিকে অত্যন্ত নোংরা পদ্ধতিতে সরিয়ে বর্তমান সরকার অধঃস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রন হাসিল করে, যার মুল শক্তি হলো আইন সচিব জহিরুল ওরফে ‘পিস্তল দুলাল’! সেই অনুগত অধঃস্তন আজ্ঞাবহ এক বিচারক হলেন ডঃ আখতারুজ্জামান, যিনি শেখ হাসিনার হুকুম তামিল করে খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠিয়েছেন। দেশের সাধারন মানুষ থেকে শুরু করে সরকারী কর্মকর্তা, রাজনীতিক, সকলেই একবাক্যে বলছেন- এই রায় শেখ হাসিনার নির্দেশিত।

প্রকৃতপক্ষে, ১৯৯১ সালে ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম ফান্ড’ নামে সরকারী কোনো তহবিল তখনও ছিল না, এখনও নাই। ১৯৯১ সালের জুন মাসে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে প্রধানমন্ত্রীর কোনো নির্বাহী ক্ষমতা ছিল না। তাই “প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল” থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বরং এমন কোনো তহবিল সৃজন করতে হলে অর্থ মন্ত্রনালয় ও সমাজকল্যান মন্ত্রনালয়ের (এতিমখানা এই মন্ত্রণালয়াধীন) অনাপত্তি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন দেয়ার আবশ্যকতা ছিল। ঐভাবে কোনো তহবিল সৃষ্টি করা হয়েছিল কি? আদতে তেমন কিছু ঘটেনি। ফলে “প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল” নামে কোনো সরকারী তহবিল ছিল না, ফলে ঐরূপ কোনো ফান্ডের টাকা আত্মসাত বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে টাকা সরানো স্রেফ কল্পনাপ্রসুত অভিযোগ ছাড়া আর কিছু নয়।

কেউ যদি অভিযোগ করে, আমার পকেট থেকে কেউ টাকা চুরি করেছে। পরে খুঁজে দেখা গেলো তার কোনো পকেটই নেই। তাহলে চুরির প্রশ্ন আসবে কি করে? এখানেও তেমন ঘটনা ঘটেছিল। প্রধানমন্ত্রীর এতিম ফান্ড ছিলই না, তাহলে টাকা তছরুপ হবে কি করে। ঐ ফান্ড কে সৃষ্টি করলো? এরকম কিছু গঠন হয়ে থাকলে সরকারী গেজেট কোথায়? অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি কোথায়? রাষ্ট্রপতির অনুমোদন কোথায়? সরকারী ফান্ড হলে প্রতিবছর তার অডিট হওয়ার কথা। এমন কিছু হয়েছিল কি? কোনো নীরিক্ষা হয়েছিল কি? হয়ে থাকলে সেই অডিট রিপোর্ট কই? আছে কি এমন কিছু? কিছুই নেই। তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ নিজেও তা স্বীকার করেছেন।

কুয়েত থেকে আসা এই ফান্ড কি বেগম জিয়া চেয়ে এনেছিলেন? না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজ সাহেবের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই ফান্ড আসে। পরে হয়ত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৌখিক নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর সচিব কামাল সিদ্দিকী ঐ বেসরকারী ফান্ডের দেখভাল করতেন। রাষ্ট্রীয় টাকা না হওয়া স্বত্ত্বেও তিনি সেটা হিসাব রাখতেন। আর কামাল সিদ্দিকীর কাজ সহজ করার জন্য তার পিএস জগলুল পাশা (১২/০৯/১৯৯২ থেকে) বা তা পূর্বসুরি ডঃ সিদ্দিকীকে সহায়তা করতেন।

এখানে উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সর্বদলীয় সম্মতিক্রমে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা চালু হয়। নতুন সরকার ব্যবস্থায় বেগম খালেদা জিয়া সরকারের নির্বাহী প্রধান হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর পুনঃশপথ নেন ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯১। প্রধানমন্ত্রীর অফিসের নতুন অর্গানোগ্রাম হয়, তাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সানুগ্রহ হয়ে আমাকে তাঁর প্রটোকল অফিসার হিসাবে নিয়োগ করেন। বাংলাদেশ সচিবালয় ছেড়ে আমরা পুরাতন সংসদ ভবনস্থ (সাবেক রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে) অফিস শুরু করি। সেখানে রাষ্ট্রপতির অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারী সমেত বিশাল জনবল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নতুন অর্গানোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত হয়। সরকারের নির্বাহী প্রধান হিসাবে নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দু’টি তহবিল আসে- এর একটি ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যান তহবিল’, অন্যটি ‘প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন তহবিল’। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে হিসাব দু’টি সচিব ডঃ কামাল সিদ্দিকী মেনটেইন করতেন। এবং তার পিএস হিসাবপত্র রাখতেন। উক্ত দু’টি তহবিলই সরকারী নিয়ম মোতাবেক গঠন করা হয়। প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে এ দু’টি তহবিলে বরাদ্দ আসে। এখনও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এ দু’টি তহবিল আছে। অন্যদিকে তথাকথিত ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’ নামে কোনো সরকারী ফান্ডের অস্তিত্ব তখনও ছিল না, এখনও নাই। মাঝখানে ৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন, তখনও এতিম তহবিলের কিছু দেখা যায়নি। এ বিষয়টা হঠাৎ উদয় হয় ২০০৮ সালে ১/১১র পরে!

মূলত, কামাল সিদ্দিকীর হাতেই এই বিতর্কের জন্ম। ১৯৯১ সালে যখন ফান্ডটি আসে ভুল নামে, এটা সংশোধনের পরামর্শ দেয়ার দায়িত্ব ছিল কামাল সিদ্দিকীর। তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সচিব। প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রি পর্যায়ের পদাধিকারীর সাথে সচিব/একান্ত সচিব নামে কিছু সরকারী কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়ার বিধান রয়েছে এই কারনে যে, তারা সরকারী আইন ও বিধি সম্পর্কে পারদর্শী। তারা পেশাদারী লোক। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রী/ মন্ত্রী পদে বসলেও তারা সরকারী আইন কানুন সম্পর্কে জানা থাকার কথা নয়। সরকারী কর্মকর্তারা মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আইনী সেফগার্ড দিয়ে থাকেন। সচিবরা সাচিবিক সহায়তা দিয়ে তাদেরকে আইনানুযায়ী চলতে সাহায্য করবেন, এটাই তাদের কাজ। প্রধানমন্ত্রী/মন্ত্রিরা যদি কোনো বেআইনী কাজ বা ভুল কাজ করে, তবে তার দায় সচিবের ওপরও বর্তায়। আলোচ্য কুয়েতি ফান্ডের ক্ষেত্রে কামাল সিদ্দিকীর পরামর্শ হতে পারত- “ডিডি ফেরত পাঠিয়ে অরফানেজ ট্রাস্টের নামে সংশোধন করে আনুন”, ‘প্রধানমন্ত্রীর’ শব্দটি থাকলে এটা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। হয় তিনি আইন জানতেন না, অথবা ‘অতিভক্তি’র কারনে তা করতে পানেননি। সঠিক পরমর্শ না দিয়ে তিনি নিজেই ব্যাংক একাউন্ট খুলে ডিডি ভাঙান। এটি একটি ভুল বা প্রমাদ ছিল বটে, তবে কোনো অবস্থাতেই ঐ ফান্ড সরকারী ছিল না। সেটা হলে অবশ্যই বছর বছর অডিট হতো এবং হিসাব থাকত মহাহিসাব নিরিক্ষকের দপ্তরে। কামাল সিদ্দিকীর এই ভুলের দায়ে বেগম খালেদা জিয়ার শাস্তি হতে পারে না। এটা অন্যায়।

কামাল সিদ্দিকী পরবর্তীতে তার কৃত ভুলের দায় থেকে বাঁচার জন্য নাকি দুদকে লিখিত চিঠি পাঠিয়েছে। তাতে দাবী করেছেন, যা কিছু করেছেন সব প্রধানমন্ত্রী জানতেন! আর তার পিএস জগলুল পাশাও লিখেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন এবং ত্রান তহবিল মেনটেইন করতেন। পাশাপাশি কথিত “এতিম ফান্ডে” টাকার হিসাবও রাখতেন আলাদাভাবে। কিন্তু তিনি কোনো নথি দেখাতে পারেননি, বা কোনো নোটশীটে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন খুঁজে পাননি। আসলে সরকারী ফান্ডের পাশাপাশি বেসরকারী ঐ হিসাব তিনি দেখভাল করতেই পারেন। এটা পিএসরা হরহামেশা করে থাকে। কামাল সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব, তার লেখা বইপত্রের বেচা বিক্রি, আয় ব্যয়, ট্যুর থেকে আয়, বিদেশী গ্রান্ট এগুলার হিসাবও পাশা সাহেব রাখতেন। তবে কি ঐ গুলাও সরকারী হিসাব ছিল? ডঃ সিদ্দিকী এবং তাঁর পিএসের স্টেটমেন্ট-এর খবর মিডিয়াতে পড়ে একজন শিক্ষক আমাকে প্রশ্ন করেছেন- “কোথায় সেই বেইমান সিদ্দিকি এবং তার পিএস পাশা? ম্যাডাম কি পান এদের মধ্যে যে, খুঁজে খুঁজে এদেরকেই তাঁর অফিসে বার বার বসান।” এর মধ্যে ’৮২ ব্যাচের এক অফিসার আমাকে বলেন, “পাশা যে সময় এই সাক্ষ্য দেয় তখন তার খুব দুর্দিন, সামনে রিটায়ামেন্ট অথচ প্রমোশন মিলছে না, হয়ত সেটা হাসিল করতেই পাশা এমন মতলবি সাক্ষ্য দিয়েছিল!  কিন্ত শেষ অবধি সেটাও হয়নি।”

একটি উদাহরন দেই- প্রধানমন্ত্রীর অফিসে কর্মকালে নিজেদের বেতন ভাতার হিসাব রাখার জন্য আমি নিজেই একটি প্রোফর্মা বানিয়ে রেজিষ্ট্রার তৈরী করি এবং ১০০ বই মুদ্রণ করে অফিসারদেরকে দেই। এখন যদি কোনো অফিসারের কাছে ঐ হিসাবের বই পাওয়া যায়, তবে দুদক কি বলতে পারবে - এটা সরকারী ফান্ড- হিসাব দাও? এভাবে সব কিছুই রাষ্ট্রীয় হিসাব নয়, কিছু বেসরকারী বা ব্যক্তিগত বিষয়ও থাকে।

আলোচ্য অরফানেজ ঘটনায় কোনো দুর্নীতির ঘটনা তো ঘটেইনি, উপরন্তু সরকারী তহবিলকে বেসরকারী ট্রাস্টকে প্রদান করে কোনো ক্ষমতার অপব্যবহার করার ঘটনাও ঘটেনি। লক্ষ করুন, কুয়েতি ফান্ডের অর্ধেক ২.৩৩ কোটি টাকা যায় বাগেরহাটে। এই অংশ নিয়ে দুদক বা সরকারের কোনো আপত্তি অভিযোগ নাই। সরকারি ফান্ড বেসকারী ট্রাস্টে দেয়ার অপরাধ ঘটলে সেটা বাগেরহাটের ২.৩৩ কোটি টাকার জন্যও মামলা হতো। তা হয়নি। কেবল বেগম জিয়া এবং তাঁর পুত্রকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানির অসৎ উদ্দেশ্যে বগুড়ার অংশের ২.১০ কোটি টাকা নিয়ে দুদকের এই মামলা। একটি ফান্ডের অর্ধেক সরকারী, আর অর্ধেক বেসরকারী, তা তো হতে পারে না। তাছাড়া, যদি তর্কের খাতিরে বলা হয় যে এটা প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন তহবিলের টাকা (যদিও আসলে তা নয়), তবুও প্রধানমন্ত্রী যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে যত ইচ্ছা ফান্ড দিতে পারেন (মপবি-৩/৬/৯১/বিধি-১১২, তারিখ ৮/৬/৯২)। কাজেই, কুয়েতের আমির থেকে পাওয়া বেসরকারী ফান্ড দু’টি এতিমখানাকে ভাগ করে দিয়ে কোনো বিশ্বাসভঙ্গ, ক্ষমতার অপব্যবহার, বা আইনের ব্যত্যয় বা সরকারী তহবিল তছরুপের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ওখানে নাম সংক্রান্ত যা কিছু ব্যত্যয় হয়েছে, তা ছিল অর্থ প্রেরকের একটি ভুল মাত্র। কুয়েতের আমিরের ফান্ড যে শহীদ জিয়ার নামে এতিমখানা নির্মানের জন্য দেয়া হয়েছিল, তা পরবর্তীতে কুয়েতের দূতাবাস চিঠি দিয়ে (কপি ছেপে দিলাম) জানিয়েছে, তবুও এসব বিষয় আখতারুজ্জানের কোর্ট উপেক্ষা করে রায়টি দিয়েছে। আমার কাছে মামলার ৭’শ পাতা ডকুমেন্ট আছে। কাজেই তথ্যভিত্তিক ছাড়া কোনো কথা এখানে বলি নাই।

মুলত, দুর্নীতি হয়নি জেনেও শেখ হাসিনা চেয়েছেন খালেদা জিয়ার নামে একটা দুর্নীতির রায় দিতে, যাতে করে উনি ভোট চাওয়ার সময় খালেদা জিয়ার নামে বাজে বাজে কথা বলতে পারেন। দেশ বিদেশের কোনো জরিপেই আওয়ামীলীগের জন্য ৩০ থেকে ৪০ সিটের বেশি আসন পাওয়ার কোনো খবর নাই। তাই খালেদা জিয়ার ভোট কমাতে এই তাগুদি রায় হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিকে হেনস্তা করার অসৎ প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, উচ্চ আদালত থেকে খালেদা জিয়া বেকসুর খালাস পাবেন।

আসলে বিদেশী অনুদানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার নামে এতিমখানা বানাতে গিয়ে একজন সৎ প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছেন, কেবল ভোটে এগিয়ে থাকাই হচ্ছে তাঁর মূল অপরাধ!

শীর্ষনিউজ২৪ডটকম