বুধবার, ১৯-সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন

রংপুর সিটি নির্বাচনের রসায়ন

Shershanews24.com

প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৭:৪৭ অপরাহ্ন

কাজী শওকত হোসেন: গত ২১/১২/২০১৭ রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। রংপুর সিটি করপোরেশনের ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করার সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে রাজনীতি, গণতন্ত্র ভোট প্রদানের স্বাধীনতাসহ গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে। শান্তি-শৃঙ্খলা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে নির্বাচন কমিশন দক্ষতা, যোগ্যতা, ন্যায়পরায়ণতা, নিরপেক্ষতা বজায় রেখে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করার ফলে নির্বাচন কমিশেনের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে, আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। রসিক নির্বাচন নিয়ে আগাম নানা সমালোচনা যারা করেছেন তাদের আশঙ্কা অমূলক বলে প্রমাণ হয়েছে। বরং তারা বহুমাত্রিক সমালোচনা করে নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে সকলেই যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রেখে সুষ্ঠু রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার জন্য কাজ করা প্রয়োজন। অথচ তাদের সমালোচনার মাত্রা মাঝে মাঝে এমন পর্যায়ে চলে যায় যে তাতে মনে হয়, একমাত্র তিনি ছাড়া কারও বিশ্বাসযোগ্যতা নাই। যে কোন প্রতিষ্ঠান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যায়। পৃথিবীর সকল দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি একদিনেই উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহন করেনি। যে কোন প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে ভাল মনের মানুষ, ভাল চিন্তার সুষ্ট পরিকল্পনা ও গভীর দেশপ্রেম না থাকলে এগোতে পারে না। যে কোন দেশ ও জাতির নেতৃত্ব যদি সৎ, দক্ষ, যোগ্য, স্বচ্ছ না হয় তা হলে সে জাতি বেশিদূর অগ্রসরও হতে পারে না। গণতান্ত্রিকভাবে অবাধ সুষ্ট নির্বাচন অর্থাৎ ভোট এবং ভাতের অধিকার অর্জন হলেই গণতন্ত্রের সকল কিছু সম্পন্ন হয়ে যায় না। একটি দেশের সকল প্রতিষ্ঠান নীতি, আদর্শ, আইন তৈরী ও প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন- সব কিছুতেই স্বচ্ছতার প্রয়োজন হয়। সবার আগে নিজেকে জবাবদিহিতার আওতায় রেখে বিবেক জাগ্রত ও সজাগ এবং সুচিন্তিত বিচার বিশ্লেষণ করে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকলে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব ও বাস্তব রূপ দেওয়া যায়। রসিক নির্বাচন একটি সুষ্ট, অবাধ, নিরপেক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো। আওয়ামীলীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে প্রায় একলক্ষ ভোটের ব্যাবধানে। আওয়ামীলীগের বড় পরাজয় হলেও গনণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে। জনগণ আওয়ামীলীগের পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতাকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে। বিএনপির প্রতিক্রিয়া দেখে হতাশ হয়েছে দেশের মানুষ। বিএনপি বরাবরের মতো নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে তাদের দৈন্যতাই প্রকাশ করেছে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে তাদের কোন ক্ষতি হতো না। আগামীতে সকল নির্বাচন যাতে রসিক নির্বাচনের মতো হয় সে কথাটি বললে অন্যায় কিছু হতো না। তাদের সঠিক বিশ্লেষণ তুলে ধরলে নিজেদের এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সকলেই লাভবান হতো। এই নির্বাচন থেকে সকলেরই অনেক কিছু শিক্ষনীয় আছে, সে কথা ভুলে গেলে চলবে না। নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ কোন বুদ্ধিদীপ্ত কাজ নয়। নির্বাচনে জয় -পরাজয় থাকবেই, ভালো নির্বাচনকে মন্দ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা জনগণ কখনোই মেনে নেয় না। মন্দ নির্বাচনকে ভালো নির্বাচন বললেই ভালো হয়ে যায় না, গ্রহণযোগ্যতা পায় না।
আওয়ামীলীগের প্রার্থী নির্বাচনে ভুল ছিল, ঝন্টু সাহেবের বয়স এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নয়ন করতে না পারার কারণে এবং দলীয় কোন্দল থাকায় এবং তার ব্যক্তিগত অসদাচরণের কারণে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা নানা ভাগে বিভক্ত থাকায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ঝন্টু সাহেবের ব্যবহারে রংপুর সিটির ভোটাররা সন্তুষ্ট ছিল না, দুর্ব্যবহারের ফল হাতে হাতে পেয়েছেন। নৌকার প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করেছেন সতেরো জন, আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। অনেকেই খেলোয়াড়, নায়িকা-গায়িকা নিয়ে হেলিকপ্টারে দৌড়ঝাপ করেছেন ঢাকা-রংপুর। সারা বছর মাঠে ছিলেন না। দলের ঐক্য, ভোটারের কাছে যাওয়া, ভুলত্রুটি শুধরে নেওয়া, উন্নয়ন যা হয়েছে সেগুলি সঠিকভাবে তুলে না ধরা- এসব গ্যাপ ছিল। আগামী দিনের উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরা এবং আস্থা অর্জনের জন্য সকল ভেদাভেদ ভুলে কাধে কাধ মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে কাজ করার মানসিকতার অভাব ছিল। যার কারণে এমন করুণ পরাজয়বরন করতে হয়েছে।
এমনিতেই রাজনীতিতে নীতি আদর্শের চরম অবক্ষয় চলছে, রাজনীতি এখন বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ সেজেছেন। রাজনীতিবিদরা ব্যবসায়ী হয়েছেন। অধিকাংশ রাজনীতিবিদের মধ্যে অহংকার, দাম্ভিকতা, দ্রুত অথবিত্তের মালিক হওয়া, পদ-পদবী পাওয়া বা আদায় করে নেওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে কাজ করছে। মনোনয়ন পাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নীতি বিবর্জিত কাজে লিপ্ত হওয়াকে তারা মামুলি ব্যাপার বলে মনে করছেন। যে যেভাবে পারছেন এই সব সুবিধাবাদীরা রাজনীতিকে কুলুষিত করছেন প্রতিনিয়ত। আদর্শবান রাজনীতিবিদের সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসছে। সরকারি বড় আমলারা অবসরে যাওয়ার পরে অনেকেই রাজনীতিবিদ হয়ে যান। অনেক সরকারি কর্মচারী নিয়মবর্হিভূত অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও সৎ মানুষের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকছে। মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে খ্যাত শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের মধ্যেও একটি অংশ অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়লে ভালো মানুষ গড়ার দায়িত্ব¡ কে নেবে সেটাই বড় প্রশ্ন। সমাজের সকল অংশেই কম-বেশি পঁচন ধরেছে। সকলে মিলে বিবেক জাগ্রত করে যার যার অবস্থান থেকে তা রোধ করতে না পারলে আগামী দিনগুলি হবে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়।
রসিক নির্বাচন প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ৩৩টি ওয়ার্ডে ১৪ জন আওয়ামীলীগের ৭জন বিএনপির, জাতীয় পার্টির ২জন, স্বতন্ত্র ১০জন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। এখানেই প্রমাণ হয়- ব্যক্তি ঝন্টুর উপর ক্ষোভের কারণে আওয়ামীলীগের নৌকায় ভোট দেয় নাই। প্রায় ৬০ হাজার হিন্দু ভোটারও প্রত্যাশা অনুযায়ী ভোট দেয়নি নৌকার প্রতীকে। আওয়ামীলীগ যত কথাই বলুক না কেন- গণতন্ত্রের বিজয়, অবাধ, সুষ্ট, নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেও এটা বড় ধরনের সাংগঠনিক বিপর্যয় হয়েছে আওয়ামীলীগের। কুমিল্লার সিটি নির্বাচনের পরেই সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। তৃণমূলের সাংগঠনিক অবস্থা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে প্রার্থী নির্ধারণ করা উচিত ছিল। সমন্বয়হীনতা, জনমত জরিপ যাচাই করে সেই ভাবে প্রস্তুতি নিলে নির্বাচনে কাঙ্খিত ফল লাভ করা সম্ভব ছিল। সেখানে ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে। বিএনপি রংপুুরে বরাবরই দুর্বল ছিল তা সত্ত্বেও এবার তারা গত নির্বাচনের চেয়ে ভোট পেয়েছে তুলনামূলক কিছু বেশি। আওয়ামীলীগ গত নির্বাচনের চেয়ে চুয়াল্লিশ হাজার ভোট কম পেয়েছে অর্থাৎ আওয়ামীলীগের ভোট কমেছে। রংপুর এরশাদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। গত নির্বাচনে মোস্তাফিজুর রহমান দ্বিতীয় স্থানে ছিল বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে। এবার প্রথম হয়ে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। এরশাদের জাতীয় পার্টি আগামীতে আওয়ামীলীগের জোটের শরীক হিসেবে দর কষাকষি করবে শক্ত অবস্থান নিয়ে এ কথা বলা যায়। আগামীতে ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে ভাল প্রার্থী ও দলের ঐক্য সুদৃঢ় না হলে, কাঙ্খিত বিজয় আনতে না পারলে এর প্রভাব পড়বে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সারা দেশেই সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে বিপর্যয় অনিবার্য।
দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক নেতার স্বেচ্ছাচারিতা, দাম্ভিকতা, নেতাকর্মীদের সম্মান-মর্যাদার অবমূল্যায়ন করা হলে, ত্যাগী ও সমাজে গ্রহণযোগ্যদের যথাযথ স্থানে মূল্যায়িত না হলে দল দুর্বল হয়, কোন্দলের সৃষ্টি হবে। সর্বগ্রাসী নেতা ও এমপিদের এবং তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এবং প্রশাসনের অতি উৎসাহী দুর্নীতিগ্রস্ত লোকজনদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। ফেইসবুক, ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টারের উপর নির্ভরশীল রাজনীতি দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। গঠনমূলক সমালোচনা রাজনীতি ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, দেশ লাভবান হয়। জনগণ শান্তি ও স্বস্তিতে থাকতে চায়। সরকারিদল, বিরোধীদল সকলের কাছেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও সঠিক ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে ন্যায় বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা সকল নাগরিকের। সততার সাথে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব যারা পালন করবে বলে জনগণ মনে করবে তারাই আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হবে।
কলামিষ্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
kazishowkot6360@gmail.com