বুধবার, ১৯-সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন

নিরাপদ সড়ক দিবস প্রসঙ্গে

Shershanews24.com

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৯:০৩ অপরাহ্ন

আহমেদ আরিফ: রংপুরের সাত বছরের শিশু শারমিন আক্তার সাথী। বাবা সাদ্দাম হোসেন আর মা শরিফা খাতুন গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। গাজীপুর থেকে দাদার সাথে গ্রামের বাড়িতে যাবার আগে সাথী বাবাকে লাল জামা আর হিল (স্যান্ডেল) এর আবদার করে।
একমাত্র মেয়ের আবদার মেটাতে জামা-জুতা নিয়ে কয়েকদিন পর গাজীপুর থেকে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন সাদ্দাম। কিন্তু পথে রংপুরের পীরগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনা তাকে নিয়ে যায় না-ফেরার দেশে।
প্রতিদিনই ডজন খানেক সাদ্দাম হোসেন না ফেরার দেশে যায়। সাথীদের লাল জামার অসংখ্য গল্প ছাপা হয় ছাপার অক্ষরে। কারণ, সন্ত্রাস চাঁদাবাজির মত সড়ক দূর্ঘটনা এখন অন্যতম আতংকের নাম। প্রতিদিনকার দৈনিক পত্রিকা, টিভি নিউজ, অনলাইন নিউজের কমন শিরোনাম 'সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত.....ও আহত.....'।
বিশিষ্ট কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে চারদিকে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে নানা সেমিনার নানা আলোচনা হয়। কয়েকদিন পর সব আলোচনা থেমে যায়। থামেনা শুধু জীবন-জীবিকার টানে পথে নামা নিরীহ মানুষের লাশ। কখনো গাড়ির চাকার নীচে,কখনো গাড়ি সহ খাদে পড়ে, কখনো গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ চলে যাচ্ছে না ফেরার দেশে। মায়ের কোলের শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউই বাদ যাচ্ছেনা।

চুরি-ডাকাতি, খুন-রাহাজানি, ঘুষ-দূর্নীতির মতই সড়ক দুর্ঘটনাকে নিয়তি মেনে নিয়েছে সাধরণ মানুষ। তরুন প্রজন্ম সস্তা দেশপ্রেম আর ভিনদেশী কালচারের এতটাই অভ্যস্ত যে ভালবাসা দিবস, বন্ধু দিবস, কিস ডে কত তারিখ চোখের পলকে বলে দিতে পারে। কিন্ত, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নিরাপদ সড়ক দিবস কত তারিখে তা জানতেও গুগুলে সার্চ দিতে হয় বর্তমান প্রজন্মকে! সানি লিওনের শরীর নিয়ে মিডিয়ায় প্রকাশিত সব তথ্য এই প্রজন্মের মুখস্থ! কিন্তু, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা কতটা মারাত্বক আকার ধারণ করেছে তা ৯৯ ভাগ তরুন প্রজন্মের কাছেই অজানা!
এনসিপিএসআরআর- এর তথ্য মতে ২০০৬-২০১৫ পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশে ৪৪,৭১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫০,৬২৭ জন নিহত হয়েছে । আহত হয়েছেন ৮২,১৫২ জন। এনসিপিএসআরআর ২০টি জাতীয় দৈনিক, আটটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সংবাদ সংস্থা এবং ১০টি আঞ্চলিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য প্রকাশ করে। বিপরীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশী। আমেরিকায় প্রতি দশ হাজার গাড়ির বিপরীতে ২ জন লোকের মৃত্যু হয়। পাকিস্তানে ১৯ জন, ভারতে ২৫ জন। কিন্তু, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার গাড়ির বিপরীতে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হয় ৬০ জন।
কেন বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা মহামারীর আকার ধারণ করেছে? প্রতিবছর ২২ অক্টোবর নিরাপদ সড়ক দিবসে এই নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। সড়ক দূর্ঘটনা রোধে নানারকম সুপারিশ করা হয়। কিন্তু, সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়না। কারণ, যারা নিরাপদ সড়ক উপহার দিবে দেশকে তারাই দেশ ও জাতির জন্য অ-নিরাপদ। গরু-ছাগল চিনলেই লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে এমন বিশেষজ্ঞদের হাতেই মানুষের ভাগ্যে! এই দেশে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের অন্যতম নেতা চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিতে জুতার মালা পরানো হয়েছিল মন্ত্রীর উস্কানিতে !
২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিকে জুতা পেটা এবং জুতার মালা পরানোর ঘটনায় কাউকেই শাস্তি পেতে হয়েছিল কি? এমন প্রশ্ন বড্ড বেমানান! কারণ, আজব দেশের গজব গণতন্ত্রেই আমাদের বাস! তাই 'নিরাপদ সড়কের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ মস্তিস্ক' এই সত্যটি উচ্চারণ করাও রিস্কি।
নিরাপদ সড়কের দায়িত্বে থাকা কর্তাদের মস্তিস্ক যদি নিরাপদ না হয় তাহলে সড়কে মৃত্যর মিছিল কখনই থামবেনা।
একটি অ-নিরাপদ কৌতুক:
ড্রাইভিং লাইসেন্স আনতে যাওয়া এক ব্যক্তিকে জেব্রা ক্রসিংয়ের ছবি, গিয়ারবক্স, রোড সাইন ছবি দেখিয়ে পরিদর্শক জানতে চাইলো কিসের ছবি?
লোকটি- কিছুই চিনি না।
পরিদর্শক- রাস্তা সম্পর্কে আপনার তো বেসিক জ্ঞানই নাই। আপনাকে লাইসেন্স দেয়া যাবেনা।
পরিদর্শকের কথা শুনে লোকটা পকেট থেকে দুটি ছবি বের করে বললেন  'উনারা আমাকে পাঠিয়েছেন।'
পরিদর্শক- উনারা কে আপনি জানেন?
লোকটি- জ্বী, উনারা দু’জন-------।
শুনে পরিদর্শক লিখে দিলেন, লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে। মন্ত্রী বলেছেন, গরু ছাগল চিনলে লাইসেন্স দেয়া যাবে। আবেদনকারীর এই যোগ্যতা প্রমাণিত হয়েছে।
শীর্ষনিউজ২৪ডটকম/ইই